উচ্চশিক্ষায় তরুণদের বিদেশযাত্রা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেরই সাধারণ একটি ব্যপার। স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট একটি গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভিন্ন আরেকটি দেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখে অসংখ্য শিক্ষার্থী। বাংলাদেশেও এই অবস্থা অনেক আগে থেকেই চলমান। তবে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে দেশত্যাগের সমিকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জের ২০২২ এর এক জরিপ অনুযায়ি ২০২১ ও ২০২২ শিক্ষাবর্ষে শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছে ১০ হাজার ৫৯৭ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী যেসব দেশে পাড়ি জমিয়েছে সেগুলোর শীর্ষে আছে মালয়েশিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, জাপান, জার্মানি সহ ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ।
প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের এই দেশত্যাগের ঘটনা। সঙ্গত কারণেই তাই প্রশ্ন উঠে যেই হারে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে সেই হারে সফলতার পরিসংখ্যানটাও বাড়ছে কিনা! যদিও সফলতার সংজ্ঞাটা আপেক্ষিক, তবে বিষয়টি যখন ‘উচ্চশিক্ষায় বিদেশযাত্রা’ তখন অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে সফলতার সাথে ঠিক কতোজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করতে পারছে। অতঃপর এটিও দেখতে হবে যেই স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীরা দেশ ছাড়ছে সেই স্বপ্নে ঠিক কতোটা পথ ধরে রেখে এগিয়ে যেতে পারছে শিক্ষার্থীরা।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় মাস্টার্স কিংবা পিএইচডিতে যারা আসে তাদের প্রায় অনেকেই ‘ফুল ফান্ডেট’ স্কলারশিপের সুযোগ পেলেও স্নাতক কিংবা তারও আগের পর্যায়ে যারা পড়াশোনার জন্য বিদেশে আসছে তাদের প্রায় সবারই নিজেদের টাকা খরচ করে পড়াশোনা করতে হয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেরই এটিই নিয়ম, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ব্যতিত। সুতরাং এখানে সফলতার চিত্রটিও দুইটি ভাগে বিভক্ত করে দেখলে ফলাফলটি আরো বেশি বোধদয় হবে।
প্রথমত যারা কোনো টাকা খরচ ছাড়াই পড়াশোনা করতে পারছে তাদের পিছুটান তুলনামূলক কম থাকায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পড়াশোনায় যত্নশীল হয়ে থাকে। তাছাড়া স্কলারশিপ টিকিয়ে রাখতে যদি কোনো শর্ত থেকে থাকে তবে সেই শর্ত পালনের জন্য হলেও শিক্ষার্থীরা কঠোর পরিশ্রম করে সফলতার সাথে পড়াশোনা শেষ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং সফলও হয়। এক্ষেত্রে আসে পড়াশোনার পর কোন দেশ তাদেরকে ঠিক কতোটা সাপোর্ট দিচ্ছে জব প্লেসমেন্টে। কিছু কিছু দেশ পড়াশোনা শেষে জব খোঁজার জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ঠ কয়েক বছর সময় দিলেও বেশিরভাগক্ষেত্রে পড়াশোনা থাকাবস্থায় জব খুঁজে না পেলে দেশে ফেরত আসতে হয় বাধ্যতামূলক। যদিও এতে কিছু শিক্ষার্থীর আপাত দৃষ্টিতে স্বপ্নভঙ্গ মনে হলেও দেশে তাদের ভালো কিছু করার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে আলাদা থাকে সবসময়ই।
আর যারা সেখানে থেকে যেতে পারে ওরা কখনো দেশে আসার চিন্তা করে না বিধায় একদিক থেকে এটি দেশের ব্যর্থতা বলা যায় যে, যোগ্য একটি জনশক্তিকে দেশ গ্রহণ করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারলো না।
সফলতা কিংবা আশির্বাদ বিবেচনার দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে যারা আংশিক স্কলারশিপ কিংবা পুরো টাকা পরিশোধ করে পড়তে আসে তাদের বেশিরভাগই বিদেশে এসে সংগ্রামী একটি জীবন পরিচালনা করে। কেউ কেউ যারা টিউশান ফি’র টাকা উপার্জনের জন্য নিজের ‘একটা কিছু করা’র ওপর নির্ভরশীল হয় তাদের বেশিরভাগই পড়াশোনায় ফোকাস ধরে রাখতে পারে না। একটা সময় হয়ত দেখা যায় সময় মতো কোর্স শেষ করতে না পেরে দেশে ফেরত আসতে হয় অথবা বিদেশে অবৈধভাবে থেকে যায়, কিংবা কেউ কেউ শ্রমিক ভিসায় শিফট হয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যতিক্রম কিছু আছে যারা প্রচুর পরিশ্রমের পাশাপাশি পড়াশোনাটাও ঠিকঠাকভাবে শেষ করতে পারে। আর এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যারা সফলতার দেখা পায় তাদের অদম্য গতি সর্বদায়ই সামনে চলতে থাকে। দেশ কিংবা প্রবাসে এদেরকে আর কখনোই পেছন ফিরে তাকাতে হয় না। কারণ এরা জানে কতোটুকু পরিশ্রমের ফলাফল ঠিক কতোটা নিজের হয়।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার এই দিক দুটি খুবই স্পর্শকাতর। এটি জীবনের গল্পের মোড় ভিন্ন দিকে নিতে কার্যকরি ভূমিকায় থাকে। সুতরাং এই দিকটি সম্পর্কে যারা সচেতন না হয় তাদের জীবনে ‘বিদেশে উচ্চশিক্ষা’ আশির্বাদ না হয়ে বরং অভিশাপ হিসেবেই থেকে যায়।
উচ্চশিক্ষায় বিদেশে আসতে হলে এজন্যই প্রতিটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজের মানুষদের দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে। পরিকল্পনায় একটি বার মিলিয়ে দেখতে হবে নিজের অর্থনৈতিক, মেধা ও পরিশ্রমের সামর্থ্য ঠিক কতোটুকু। বিশেষ করে যেই স্বপ্ন নিয়ে বিদেশযাত্রায় পথচলা শুরু হবে সেই স্বপ্ন সত্যিই আশির্বাদ হয়ে জীবনকে আলোকিত করবে নাকি অভিশাপের কালো অধ্যায় হয়ে জীবনকে বিভিষিকায় ঠেলে দিবে।
লেখক: লিড ফ্যাব্রিকাশন এনালিস্ট, মেট্রো গ্রুপ এসডিএন বিএইচডি, মালয়েশিয়া শিক্ষার্থী— ইউনিভার্সিটি পূত্রা মালয়েশিয়া, সাবেক ভিপি— মাহসা ইউনিভার্সিটি।
আজকের সিলেট/ডিটি/ডি/এসটি
শিক্ষাঙ্গণ ডেস্ক 








