সিলেটের বিশিষ্ট পীর জকিগঞ্জের ফুলতলীর আব্দুল লতিফ চৌধুরী। আজ থেকে ১৬ বছর আগে ইহলোক ত্যাগ করেন। তার মরণোত্তর ইসালে সওয়াব মাহফিলে এবারও জড়ো হবেন মরহুম আব্দুল লতিফ চৌধুরী’র হাজার হাজার মুরিদান। মুরিদানদের বরণ করতে সেজেছে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলি এলাকার বিস্তৃর্ণ বালাই হওর।
আজ থেকে ১৬ বছর আগে- ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে চলে যান পীর আব্দুল লতিফ চৌধুরী । দেশ-বিদেশের ছাত্র, ভক্ত-অনুরাগী ও শুভানুধ্যায়ী হয়েছিলেন শোকে কাতর। জানাযার নামাজে নেমেছিলো মানুষের ঢল।
মরহুম পীর আব্দুল লতিফ চৌধুরী (রাহ.)-এর ওফাতের পর প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারি বালাই হাওরে আয়োজন করা হয় ইসালে সওয়াব মাহফিলের। মাহফিলে সমাগম ঘটে তাঁর মুরিদসহ হাজার হাজার মানুষের। এবারও ফুলতলি সংলগ্ন জকিগঞ্জের বালাই হাওরে শামিয়ানা টানিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল প্যান্ডেল। করা হয়েছে আলোকসজ্জা। এবারের মাহফিলটি ১৬ তম। মাঘের কনকনে শীত উপেক্ষা করে বালাই হাওরে সোমবার রাতে ঘটবে ফুলতলিভক্তদের মিলনমেলা।
ইসালে সওয়াব মাহফিল বাস্তবায়ন কমিটির সমন্বয়কারী মাহমুদ হাসান চৌধুরী রায়হান গণমাধ্যমকে জানান- প্রতিবারের ন্যায় এবারও লাখো মানুষের সমাগমের আশা করা হচ্ছে। তাদের বরণ ও মেহমানদারি করতে সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। সোমবার (১৫ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় ফুলতলী (রাহ.)-এর মাজার জিয়ারত ও তাঁর বড় ছেলে মাওলানা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরীর দোয়ার মাধ্যমে মাহফিলের কার্যক্রম শুরু হবে।
মাহফিল চলবে মঙ্গলবার ফজর পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন অধিবেশনে খতমে কোরআন, খতমে বুখারি, খতমে খাজেগান, দালাইলুল খায়রাত শরিফের খতম, জিকর, বিষয়ভিত্তিক বয়ান ও স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা হবে। মাহফিলে গুরুত্বপূর্ণ তা’লিম-তরবিয়ত প্রদান করবেন ফুলতলী (রাহ.)-এর বড় ছেলে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী। এছাড়া দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত পীর-মাশায়েখ, আলিম, ইসলামী চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মাহফিলে উপস্থিত থাকবেন এবং বক্তব্য রাখবেন।
মাহফিলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাস্তবায়ন কমিটির নিজস্ব ৬২০ জন স্বেচ্ছাসেবক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। তাদেরকে ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এবার মাহফিলের দিন দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত আগত লোকজনকে আপ্যায়ন করানো হবে। তবে রাতে এরকম কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। জকিগঞ্জ-আটগ্রাম রোডে রতনগঞ্জ বাজারের উত্তর ও দক্ষিণ উভয়দিকে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বৃহৎ পরিসরে দশটি মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে। রতনগঞ্জ বাজারের পাশে করা হয়েছে মোটরসাইকেল পার্কিং ব্যবস্থা। এছাড়া প্রতিবারের মতো এবারও মাহফিল বাস্তবায়ন কমিটির স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতা করবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
এদিকে, ফুলতলি (রাহ.)-এর ইসালে সওয়াব মাহফিলে যুক্ত হয়েছেন ভিন্ন মাত্রা। কারণ- সদ্য অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তাঁর কনিষ্ট পুত্র হুছামুদ্দীন চৌধুরী। যে কারণে অন্যবারে তুলনায় এবারের মাহফিলে রাষ্ট্রীয় ও ভিআইপি অতিথি বেশি উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে- নতুন সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সিলেট-২ আসনের এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী সোমবার রাত ৮টায় মাহফিলে উপস্থিত হবেন।
উল্লেখ্য, এতসব আয়োজন যাকে কেন্দ্র করে তিনি হলেন- ‘দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’র প্রতিষ্ঠাতা, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিক্ষক ও মুরিদানের পীর আব্দুল লতিফ চৌধুরী রাহ.। যিনি আপন মেধা, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও আধ্যাত্মীকতার মধ্যদিয়ে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়।
১৯১৩ সালে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মুফতি মাওলানা আব্দুল মজিদ রাহ. ছিলেন একজন বড় আলেম।
দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আল্লামা ফুলতলি রাহ.-কে ভালোবাসতেন। গরিব-অসহায় মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তিনি।
জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি আলিয়া মাদরাসার ফাযিল শ্রেণিকে ‘ডিগ্রি’ ও কামিলকে ‘মার্স্টাস’ এর মান প্রদান এবং স্বতন্ত্র ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে সিলেট থেকে কয়েক হাজার গাড়ি নিয়ে ঢাকা অভিমূখে লংমার্চ কর্মসূচি পরিচালনা করেন।
ফুলতলী রাহ. দেশ-বিদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং শত শত মসজিদ মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এরমধ্যে ‘দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট, লতিফিয়া এতিম খানা, বাদেদেওরাইল ফুলতলী আলিয়া মাদরাসা, হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুনাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা, বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ, বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া, লতিফিয়া ক্বারি সোসাইটি, লতিফিয়া কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ আনজুমানে মাদারিসে আরাবিয়া, মুসলিম হ্যান্ডস বাংলাদেশ, ইয়াকুবিয়া হিফজুল কুরআন বোর্ড, যুক্তরাজ্যে ‘দারুল হাদিস লতিফিয়া, আনজুমানে আল ইসলাহ ইউকে, লতিফিয়া উলামা সোসাইটি, লতিফিয়া কারি সোসাইটি ইউকে, আল ইসলাহ ইয়ুথ ফোরাম, কিরাত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আল মজিদিয়া ইভিনিং মাদরাসা, লতিফিয়া গার্লস স্কুল এবং যুক্তরাষ্ট্রে ‘আল ইসলাহ জামে মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামিক সেন্টার, নিউইয়র্ক সুন্নিয়া হাফিযিয়া মাদরাসা, শাহজালাল লতিফিয়া মাদরাসা’ উল্লেখযোগ্য।
২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ভক্ত-অনুরাগীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে স্রষ্টার সান্নিধ্যে চলে যান আব্দুল লতিফ চৌধুরী পীর ছাহেব (রাহ.)।
আজকের সিলেট/ স্টাফ/ বার্তা/ কে আর
নিজস্ব প্রতিবেদক 








