সুনামগঞ্জে পানিবন্দী লাখো মানুষ, প্লাবিত নতুন নতুন এলাকা
শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ০৬:৫৮ AM

সুনামগঞ্জে পানিবন্দী লাখো মানুষ, প্লাবিত নতুন নতুন এলাকা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/০৬/২০২৪ ০৫:৪৮:১২ AM

সুনামগঞ্জে পানিবন্দী লাখো মানুষ, প্লাবিত নতুন নতুন এলাকা


পাহাড়ি ঢল ও অব্যাহত বর্ষণের ফলে সুনামগঞ্জ জেলার সকল নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। শহরের অনেক রাস্তাঘাট পানিতে ঢুবে গেছে। মানুষজন ঘর বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। টানা বর্ষণ-পাহাড়ি ঢলে পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ।

মঙ্গলবার সুরমা নদী তীরবর্তী সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বেশ কয়েকটি এলাকার বাসা বাড়িতে পানি প্রবেশ করছে।  

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।  

জানা যায়, ভোর রাত থেকে সুনামগঞ্জে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ফলে শহরে ফের পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করায় অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে।

সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে ৫০টি পরিবার এরইমধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। বসতভিটায় পানি ওঠায় বাধ্য হয়ে সোমবার রাত থেকে পরিবার পরিজন ও গৃহপালিত পশু নিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে শ্রমজীবী মানুষ। গ্রামীণ সড়ক একের পর এক ডুবছে। জেলার ছাতক থেকে গোবিন্দগঞ্জ সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব সড়কের ওপর দিয়ে তীব্র স্রোত যাচ্ছে। এছাড়া, সোমবার থেকেই প্লাবিত আছে জেলার ১০ উপজেলার শতাধিক গ্রাম। ভোগান্তিতে আছে দুই লাখের বেশি মানুষ।

স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ও গতরাতে সুনামগ‌ঞ্জে অস্বাভাবিক অব্যাহত বর্ষণের ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি আসছে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নদী দিয়ে। এছাড়া নদীর পা‌নি প্রবেশ কর‌ছে সুনামগঞ্জ পৌর শহ‌রের বি‌ভিন্ন আবা‌সিক এলাকায়। প্লা‌বিত হ‌তে শুরু ক‌রে‌ছে নিম্নাঞ্চল।

পাউবো জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ৩৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে আর চেরাপুঞ্জিতে ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। এতে বাড়তে পারে নদ-নদীর পানি।

এছাড়াও জেলার ছাতক, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ সদর ও তা‌হিরপুর উপ‌জেলার অন্তত ৩০ গ্রা‌মের মানুষ পানিবন্দী হ‌য়ে আছে। জেলার অন্তত শতা‌ধিক অভ্যন্তরীণ সড়ক ত‌লি‌য়ে যাওয়ায় চরম দু‌র্ভো‌গে প‌ড়েছেন বা‌সিন্দারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল। বাসা বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বর্তমানে সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০২ সেন্টিমিটার ওপরে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।  

সীমান্তের ওপারে মেঘালয়-চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদী দিয়ে পানি সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে নামছে। সেইসঙ্গে আসছে পাহাড়ি ঢলের পানি। দোয়ারা বাজারের লক্ষ্মীপুরের খাসিয়ামারা নদীর বেড়িবাঁধ ও বোগলাবাজার ইউনিয়নের চিলাই নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় দুই ইউনিয়নের অন্তত ৫০টি গ্রাম ও সড়ক প্লাবিত হয়ে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।  

অন্যদিকে, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ভারী বর্ষণ এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে আবারও ছাতকের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় ক্রমশ; বৃদ্ধি পাচ্ছে ছাতকের সুরমা নদীর পানি। ক্রমাগত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলসহ শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে প্রবল বেগে ঢলের পানি প্রবেশ করছে। এই ইউনিয়নের ১০ থেকে ১২টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

সুনামগঞ্জ পৌরসভার বড়পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল বাসির বলেন, পুরো সুনামগঞ্জ শহরে পানিতে ভাসছে। আমার ঘরে হাঁটুর উপরে পানি। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। মানুষ অনেক কষ্টে আছে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা না পেলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

দোয়ারা বাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ঢলের পানিতে বসতভিটায় থাকা খাবার ও পরার কাপড় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা এখন খাদ্য সংকটে আছি।  

দোয়ারা বাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহের নিগার তনু জানিয়েছেন, দোয়ারা বাজার উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হলেও কেউ ওঠেনি।  তবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।   

তাহিরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা পারভীন ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মফিজুল ইসলাম জানিয়েছে, পানি বৃদ্ধি হলেও আমরা সতর্ক রয়েছি। স্কুল-কলেজগুলোতে আশ্রয় কেন্দ্র খোলার নির্দেশনা দিয়েছি।  

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও মৌসুমী মান্নান জানিয়েছেন, সদর উপজেলায় ৬২টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সকল ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।  

সুনামগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় নদীর পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক বাড়ি ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৮০ ভাগ নিমজ্জিত হয়েছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়া,বড়পাড়া,পশ্চিম হাজীপাড়, আরপিনগর, উকিল পাড়া,নবীনগর, ষোলঘর, ধোপাখালী কাজীর পয়েন্ট বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।  

সদর উপজেলার লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা রেনু মিয়া বলেন, সকালে দোকান খুলতে এসে দেখি সব মালামাল পানিতে ভেসে আছে। ঈদের জন্য যে মালামাল তুলেছিলাম তার বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে।  

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, বন্যা মোকাবিলার জন্য সকল প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সভা করে সকল ইউএনও দের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছি।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর