অতীতেও অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে, ভারতীয় ঢল নেমেছে। বন্যাও হয়েছে সিলেটে। কিন্তু এরকম অল্প সময়ে এমন বন্যা অতীতে কখনো হয়নি। সিলেট নগরও এমনভাবে ডুবে যায়নি। যেমনটা হয়েছে ২০২২ সালে এবং এবার। এ প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন কেন বারবার ডুবছে সিলেট?
২০২২ সালে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ ছিলেন পানিবন্দী। আর এ সপ্তাহে সৃষ্ট বন্যায় সিলেটের চার জেলার ২২ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দী। তবে ভোগান্তি ও দুর্ভোগ ২০২২ এর চেয়ে কোন অংশে কম নয়।
কেন ঘন ঘন বন্যা হচ্ছে সিলেটে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার, নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ভারতের ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি এবং বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ এক তথ্য।
গত ডিসেম্বরে রয়্যাল মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত এ গবেষণায় বলা হয়, গত চার দশকে ভারতের মেঘালয়-আসাম এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে থাকলেও একদিনে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা চার গুণ বেড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টাচ্ছে, যা সিলেট অঞ্চলে ঘন ঘন আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করছে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে। ২০২২ সালের ১৭ জুন সিলেট অঞ্চলে যে প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয় সেদিন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে একদিনে ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।প্রবল এ বৃষ্টিপাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রবল পানির তোড়ে তলিয়ে যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ভয়াবহ বন্যাকবলিত হয় সিলেটের ৮৪ ভাগ এবং সুনামগঞ্জের ৯৪ ভাগ এলাকা।
গত ২৯ মে চেরাপুঞ্জিতে একদিনে ৬৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। সেই রাতেই সিলেট জেলার পাঁচটি উপজেলা প্লাবিত হয় আকস্মিক বন্যার পানিতে।এদিকে, বিশেষজ্ঞরা ঘন ঘন সিলেট ডুবির ঘটনায় আরো অনেক কারণকে চিহ্নিত করেছেন। তারা বলছেন, হাওরের সাত জেলার হাওর-বাঁওড় ও নদ-নদীর মধ্যে সংযোগ ছিল। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নেই। এছাড়া সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারায় কয়েকশ’ স্থানে চর জেগেছে। নদ-নদী নাব্যতা হারালেও খনন হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তো রয়েছেই। এসবই বন্যার মূল কারণ।
অপরদিকে আবহাওয়া-বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদেরা বলছেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। বিপরীতে প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। এছাড়া দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি, টাঙ্গুয়াসহ অনেক হাওরে এখন নিয়মিত পর্যটক যাচ্ছেন। অনেক পর্যটক পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলসহ অপচনশীল দ্রব্য হাওরে ফেলছেন। সেসব গিয়ে জমা হচ্ছে তলদেশে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম মো. মুন্না বলেন, সিলেট অঞ্চলে ঘন ঘন বন্যার কারণ আসলে দুই ধরনের। প্রথমটি প্রাকৃতিক ও দ্বিতীয়টি কৃত্রিম। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ যেমন দায়ী তেমনি আমাদের ভূমিকাও নেহায়েত কম নয়। ভারতের মেঘালয়ে অতি বৃষ্টি থেকে যে পানি আসে, সেটি বেশির ভাগই সুরমা ও কুশিয়ারা বয়ে নিয়ে যায়। তবে বর্তমানে বেশি পরিমাণ পানি প্রবাহের সক্ষমতা আমাদের নদীগুলোর নেই। এর মূল কারণ নদীর নাব্যতা সংকট। এছাড়া কৃত্রিম কারণের মধ্যে রয়েছে- অপরকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা। এর ফলে সম্প্রতি সিলেট অঞ্চল ঘন ঘন বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
এদিকে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বলছে, সিলেটে অনেক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান নদী দখল করে আছে। নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতার কারণে জেলা দুটি বন্যার কবলে পড়ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, সিলেট জেলায় নদী আছে ১৬টি। ২০১৯ সালে কমিশন অনুসন্ধান করে দেখেছিল, ৩৩০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব নদী দখল করেছে। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে নদী আছে ৩৬টি। সে সময় এই জেলায় দখলদারদের তালিকায় ছিল ৬৯৫ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নাম। সব মিলিয়ে দুটি জেলায় ১ হাজার ২৫ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এসব নদীর বিভিন্ন জায়গা দখল করেছিল।পরবর্তী সময়ে দুই জেলার প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ৩৩৭ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দখলদারি উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছিল বলে জানায় কমিশন। তবে অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দখলদারি উচ্ছেদ করা যায়নি। গত দুই-তিন বছরে নতুন করে নদী দখল হয়েছে।
সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর মধ্যে আছে সোমেশ্বরী, সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই। ভারতের মেঘালয়ের বৃষ্টির পানি এসব নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে একপর্যায়ে মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন বলছে, সিলেট শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর দুই তীর দখল করে বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। এ রকম উদাহরণ আছে অনেক। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ উজানে নদী দখল করেছে। জায়গা ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করেছে। নদ-নদীর ওপর অপরিকল্পিতভাবে ব্রিজ, কালভার্ট, স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। নদী দখল করে বহু জায়গায় হাটবাজার, দোকানপাট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান হয়েছে।
সুনামগঞ্জে নদীর তীরে অবৈধ বাজার ও শিল্পকারখানা আছে ৪৭টি। এসব বাজার ও শিল্পের যাবতীয় আবর্জনা-বর্জ্য ফেলা হয় নদীতে। এ কারণে নদীতে চর পড়েছে। নদীর নাব্যতা কমেছে।
বৃহত্তর সিলেটের অনেক জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে বালু, মাটি ও পাথর উত্তোলন করা হয় বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এগুলো উত্তোলনের সময় নদীর পাড় কাটা পড়ে, যেখানে-সেখানে মাটির স্তূপ তৈরি হয়। আবার কখনো কখনো নদী খননের মাটি রাখা হয় অপরিকল্পিতভাবে। সিলেট জেলার অনেক নদী মৃতপ্রায়।
বন্যা প্রসঙ্গে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবহমান নদীগুলো দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিত বালু ও পাথর উত্তোলনসহ নানা কারণে নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। নদীর গতিপথ পাল্টেছে। উত্তর থেকে আসা পানি বহন করার ক্ষমতা হারিয়েছে নদীগুলো। এখনকার বন্যার এটাই প্রধান কারণ।
এ অবস্থায় আশার কথা শুনিয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেছেন, সিলেটবাসীকে বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে সবধরনের পদক্ষেপ গ্রহনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সুরমা নদী পরিদর্শনকালে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, আগামীতে সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যা কবলিত এলাকা কিভাবে সহনীয় পর্যায় নিয়ে আসতে পারি সে লক্ষে আমরা আলোচনা করেছি। ইতিমধ্যে সুরমা নদীর ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১২ কিলোমিটার খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বন্যার পানি কমে গেলে বাকিটুকু খনন করা হবে। এছাড়াও সামগ্রীক ভাবে সুরমা-কুশিয়ারা নদী খনন করবো। সুনামগেঞ্জর ছোট বড় ২০টি নদী আমরা খনন করবো।
বন্যায় এবার অনেকটা ফিকে হয়ে গেলো ঈদের আনন্দ। মানুষজন স্বাচ্ছন্দে দিতে পারেননি কোরবানী, যেতে পারেননি ঈদগাহে। ঈদের আনন্দকে রেখে মানুষকে লড়াই করতে হয় পানির সাথে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








