সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে বন্যা-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি। দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। ফলে প্রতিদিন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ঘরে ফেরা মানুষদের পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়। বন্যায় বিধ্বস্ত ঘর মেরামত, বিশুদ্ধ পানির সংকট ও রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় চলাচলে দুর্ভোগ ও পর্যাপ্ত ত্রাণের সংকটসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন বন্যায় প্লাবিত এলাকার মানুষ। কয়েক দফা বন্যায় ব্যাহত হয়েছে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। এখন পানি কমতে শুরু করলেও দেখা দিয়েছে বন্যা-পরবর্তী বিভিন্ন রোগ। যদিও এর সঠিক পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। এটি প্রকাশ্যে আসতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, বন্যার পানি নেমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। তবে যে সব প্রস্তুতি থাকার কথা, তা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধের যে মজুদ রয়েছে, তাতে সংকট হবে না। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বোঝার জন্য আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। কারণ আশ্রয় কেন্দ্র থেকে মানুষ মাত্র বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে।
এদিকে বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সংক্রামক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যবিদরা।
তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট সৃষ্টি হবে। পুষ্টির অভাব দেখা দেবে।
পানি পুরোপুরি নামার পর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান জানান, ২০২২ সালে যখন সিলেটে বন্যা হয়েছিল, তখন অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছিল। এবারের বন্যা ততটা ভয়াবহ নয়। তবে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। বন্যায় স্বাভাবিকভাবেই শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, পেটের পীড়া দেখা দেয়। বিভাগের কয়েকটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। তবে বেশিক্ষণ স্বাস্থ্যসেবা যেন ব্যাহত না হয় এজন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত ছিল। তবে ওষুধের মজুদ যা রয়েছে তাতে সংকট দেখা দেবে না। রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। যারা আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়িতে ফিরে গিয়েছেন, তারা যেন অসুস্থতার মধ্যে না পড়ে, এজন্য আমরা সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছি। বন্যা-পরবর্তী রোগ বাড়লে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে।’
জানা যায়, বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ে পড়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা। সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে প্লাবিত হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভাগের চারটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৬৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কমিউনিটি ক্লিনিকের ৫১টি সিলেটে, ১৩টি সুনামগঞ্জে, পাঁচটি মৌলভীবাজারে ও একটি হবিগঞ্জে।
তাদের মতে, বন্যাকবলিতদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে সিলেট বিভাগে ৪০০ মেডিকেল টিম কাজ করছে। এর মধ্যে সিলেটে ১২৬টি, সুনামগঞ্জে ৯৯, হবিগঞ্জে ৯৪ ও মৌলভীবাজারে ৭৪টি রয়েছে। প্রথম দিকে সিলেট জেলার তিনটি উপজেলায় হাসপাতাল চত্বর প্লাবিত হওয়ায় কয়েকদিন ব্যাহত হয় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা।
সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলার ২৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র পানিতে নিমজ্জিত হয়। এর মধ্যে ১০টি কেন্দ্র শতভাগ নিমজ্জিত হয়। চারটি কেন্দ্রের সিংহভাগই প্লাবিত হয়। তবে তাৎক্ষণিক ওষুধপত্রসহ পণ্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে সেবা কার্যক্রম সাময়িক বাধাগ্রস্ত হয়।
সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক তপন কান্তি ঘোষ জানিয়েছেন, চলমান বন্যায় সিলেট জেলার ২৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র প্লাবিত হওয়ায় সাময়িকভাবে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হলেও এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
সিলেট জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান জানান, সিলেটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। মানুষজন আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ফিরছেন বাসা বাড়িতে। তবে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ ও ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি









