বিএনপির আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে ‘সিন্ডিকেট’!
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৬:০২

বিএনপির আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে ‘সিন্ডিকেট’!

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০/০১/২০২৪ ১০:১৩:৩২

বিএনপির আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে ‘সিন্ডিকেট’!


সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থতার ইতিহাস দীর্ঘ হচ্ছে বিএনপির। দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪, ১৮ এবং এবার দ্বাদশ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েও আন্দোলন সফল করতে পারেনি দলটি। অনেকের মতে, এবারের আন্দোলন ২০১৪ সালের মতোও জমাতে পারেনি তারা। এজন্য দলের মধ্যে থাকা একটি সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন নেতাকর্মীদের অনেকেই।

আন্দোলনে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, কর্মীরা আন্দোলনে ব্যর্থ হয়নি। তারা জীবনবাজি রেখে মাঠে ছিল। এ আন্দোলনে নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মী।

তারা বলছেন, সরকার পতনের একদফা ঘোষণা করার পর কেন নির্বাচন বর্জনের জন্য জনগণের মাঝে লিফলেট বিতরণ করে একদফা আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো? একদফার মধ্যে তো লিফলেট বিতরণ বা গণসংযোগের কথা ছিল না। দলে থাকা একটি সিন্ডিকেট ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভুল বুঝিয়ে অন্ধকারে রেখেছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে নেতাকর্মীদের। এই সিন্ডিকেট চিহ্নিত হলেও ভয়ে মুখ খুলছে না অনেকেই।

তারা বলছেন, এই সিন্ডিকেট কতটুকু চতুর হলে লিফলেট বিতরণ করে হাইকমান্ডকে বুঝিয়েছে ভোটাররা লিফলেট বিতরণে সাড়া দিয়ে ভোট দিতে যাননি। এসব করে তারা বিভিন্নভাবে আর্থিক ফায়দা লুটেছে বলেও অভিযোগ করেন অনেক নেতাকর্মী। অভিযোগ তুলেছেন কমিটি বাণিজ্যেরও। কাক্সিক্ষত আন্দোলনে সফলতা পেতে হলে আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সিন্ডিকেটমুক্ত হতে হবে বলে জানান তারা।

কারা এই সিন্ডিকেটের হোতা, এমন প্রশ্নে সরাসরি সিন্ডিকেট সদস্যদের নাম না বললেও তারা বিশেষ ইঙ্গিত দিয়েছেন। বলেছেন, সিন্ডিকেটের একজন দেশের বাইরে আছেন। আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য, যিনি দেশেই আছেন। এছাড়া মধ্যম সারির এক প্রভাবশালী নেতাও রয়েছেন সিন্ডিকেটে, যার কাছে স্থায়ী কমিটির কোনো কোনো সদস্যকেও ধরনা দিয়ে দেখা যায়।

অবশ্য এই সিন্ডিকেটের বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, যারা দলের ভেতর সিন্ডিকেটের কথা বলেন তারাই সিন্ডিকেট। মাঠের কর্মীদের মধ্যে যারা অত্যাচারিত হয়েছেন, জেল খেটেছেন তারা হতাশ নন। বরং আন্দোলনে তাদের স্পৃহা অনেক বেশি। যারা আন্দোলনে রিস্ক নেননি, তারাই সিন্ডিকেটের কথা বলে দলের মাঝে অনৈক্যের সৃষ্টি করতে চায়।

তিনি বলেন, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব এবং সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করে কর্মীরা আন্দোলনে ছিল। আর আন্দোলনে ছিল বলেই এ আন্দোলনকে সমর্থন করে দেশের ৯৩ শতাংশ মানুষ এই ডামি নির্বাচন বর্জন করেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেন, আমাদের এ আন্দোলন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। যে আদর্শে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে। এই একদলীয় সরকারের বিরুদ্ধে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের সংগ্রামে প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। এখানে তাই হতাশার কোনো প্রশ্ন নেই। হতে পারে এখনই হয়তো আমাদের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়নি কিন্তু আমাদের এ সংগ্রাম একটি অন্যায় রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনগণের। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে আমাদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

বৃহত্তর ঢাকা বিভাগের এক জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, অনেকে দোকান বিক্রি করে, জমি বিক্রি করে আইনিভাবে মামলা মোকাবেলা করছেন। শারীরিক নির্যাতন করে তাদের কারাঅন্তরীণ করা হয়েছে। মাত্র পাঁচ শতাংশ নেতাকর্মী স্বাবলম্বী। তাদের কথা দল কতটুকু ভেবেছে? আন্দোলন সফল করতে কর্মীরা ব্যর্থ হয়নি, ব্যর্থ হয়েছে দল। নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়ে দলের প্রথমেই উচিত অত্যাচারিত নেতাকর্মী এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।

রাজশাহী বিভাগের এক জেলা বিএনপির নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলে জানালো দলের অনেকে গ্রেপ্তার হবে। সে ক্ষেত্রে বিকল্প নেতৃত্বও ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার মিল পেলাম না। মোট কথা এ আন্দোলনে কোনো রোডম্যাপই ছিল না। যার কারণে বিনা বাধায় সরকার একতরফা নির্বাচন করে গেলো।

এদিকে, আন্দোলনে যুবদল, ছাত্রদল, কৃষক দলসহ অঙ্গ সংগঠন শীর্ষনেতারাও সরব ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে বলছেন নেতাকর্মীরা। যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ ইকবাল খানকে কয়েকদিন রাজপথে দেখা গেলেও বাকি শীর্ষনেতাদের মাঠে নামতে দেখা যায়নি। তবে, বিচ্ছিন্নভাবে ছাত্রদল, যুবদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা ছিলেন সক্রিয়। বিশেষ করে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, ফজলুর রহমান খোকন, কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল নিজ কর্মী বাহিনী নিয়ে রাজপথে ছিলেন সরব।

অন্যদিকে আন্দোলনে ব্যর্থতার জন্য বিএনপির নেতৃত্বের দুর্বলতার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের ভূমিকা এবং সরকারের ‘ভয়ংকর’ দমননীতির কথা বলেছেন অনেকে। তাঁরা বলছেন, দেড় যুগ ধরে সরকার বিএনপিসহ বিরোধী দলকে অমানবিক নির্যাতন, গ্রেপ্তার, মামলা ও বিচারের মধ্যে রেখেছে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে একজোট হয়ে গেছে, তা আগে দেখা যায়নি। পাশাপাশি এত মামলা, গ্রেপ্তার, চাপ ও প্রলোভনের পরও দল ভাঙেনি এবং মানুষ ভোটে সেভাবে সাড়া দেয়নি; এটাকে সফলতা হিসেবে দেখছেন দলটির অনেকে।

আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ বিদেশনির্ভরতা। বিশেষ করে, পুরো আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল বিএনপির নেতৃত্ব। নেতা-কর্মীদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করা হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাসহ জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে এমন কিছু পদক্ষেপ আসবে, তাতে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে যাবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, দলের মাঝে একটি সিন্ডিকেট আছে, একথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমরা জানতাম নির্বাচন হয়ে যাবে। আমরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সঙ্গে পেরে ওঠবো না। আমরা তো সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাসী নই। তাছাড়া নেতাকর্মীদের মাঝে কোনো হতাশার ছাপ আমরা দেখতে পাইনি। তারেক রহমান সাহেব ছাড়াও দলের সিনিয়র নেতারা তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছেন।

বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, হয়তো আমাদের সমন্বয়হীনতার অভাব ছিল। তাছাড়া সরকার যে ২৮ অক্টোবর আমাদের ওপর এমন স্টিমরোলার চালাবে তা বুঝতে পারিনি। এছাড়া এ আন্দোলন জামায়াত, চরমোনাইসহ বৃহৎ ইসলামী দলগুলো আমরা একত্রে করতে পারতাম। হয়তো এটি আমাদের ব্যর্থতা।

আজকের সিলেট/ডিটি/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর