মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষনার মধ্য দিয়ে সূচিত মুক্তিযদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী হায়নার দল আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করলেও, সিলেট মুক্ত হয়ে যায় বিজয়ের একদিন পূর্বে অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর। এদিন তৎক্ষালিন মেজর মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের মুক্তিযুদ্ধারা সম্মূখসমরে যুদ্ধ করে সিলেটকে শত্রুমুক্ত করেন। তাই ১৫ ডিসেম্বর সিলেটবাসীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর এই দিনে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করেন সিলেটবাসী।
১৯৭১ সালের জেড ফোর্সের মুক্তিযোদ্ধারা বীরের মতো সিলেট শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন আর শহর থেকে পালাতে শুরু করে পাক বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর, রাজাকার, আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা। তাই ১৫ ডিসেম্বর সকালের চিত্রটা ছিলো অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। অন্য এক আনন্দ প্রবাহ বয়ে গেছে সিলেটের আকাশ জুড়ে। রাজপথ শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত ছিলো। প্রকম্পিত ছিলো সেদিনের প্রহর। সিলেট শহর জুড়ে ছিলো জনতার উচ্ছাস। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বয়সী মানুষের মিছিল মিশে গিয়েছিলো এক মোহনায়। সব কণ্ঠস্বর এক স্রোতে মিশে গিয়েছিল সেদিন।
১৯৭১ সালের সেই দিনগুলো সিলেটবাসীকে তুমুলভাবে নাড়া দিয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সারা দেশের মতো সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ ছিলো ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তানি দোসররা বাঙালি জাতির উপর নির্লজ্জভাবে সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি সিলেটের মুক্তিপাগল মানুষ। সকল শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেই রুখে দাড়ায় তাঁরা। সেদিন সিলেটের অনেক এলাকা জ্বলে পুড়ে ছারখার হচ্ছিলো। চারদিকে জ্বলছিল আগুনের লেলিহান শিখা। বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল আলী আমজাদের ঘড়ি। কিনব্রিজ হয়েছিল দ্বিখন্ডিত। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল বিভিন্ন স্থাপনা।
জানা যায়, ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে মুক্তিবাহিনীর একটি দল খাদিমনগর এলাকায় এসে অবস্থান নেন। একই দিন মুক্তিযোদ্ধাদের আরও কয়েকটি দল দক্ষিণ জালালপুর ও পশ্চিম লামাকাজিতে আসে। তখন ফাঁকা ছিলো শুধু উত্তর দিক। কিন্তু সেদিকে সীমান্তবর্তী পাহাড়, বনাঞ্চল থাকায় দোসরদের পালাবার কোনো পথ ছিলো না। এর পর দু’জন তরুণ বীর মুক্তিযোদ্ধা খাদিমনগর থেকে একটি গাড়িতে চড়ে পাকিস্তানি দোসরদের আত্মসমর্পণের জন্য বেশ কয়েক ঘণ্টা শহরে মাইকিং করতে থাকেন। তাদের সেই মাইকিংয়ের মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে নতুন করে সাহসের সঞ্চার হয়। তখন উত্তপ্ত সিলেট শহর।
এদিকে, মাইকিং করতে করতে সাহসী দুই মুক্তিযোদ্ধা ক্রমান্বয়ে শহরের দিকে আসেন। পথে পথে, বাসা-বাড়ি, দোকানপাটে থাকা উদ্বিগ্ন মানুষ তাদের কণ্ঠের ধ্বনি শুনে ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এসে তাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন। অনেকেই তাদের উদ্দেশ্যে শ্লোগান তোলেন।শহরের যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে লোকজন বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে তাদের দেখছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের মিছিল। তখন হানাদারদের অবস্থান ছিলো সিলেট সরকারি কলেজের আশপাশে।
প্রকাশ্যে আসতে না পারলেও গোপনে তারা সংগঠিত হওয়ার জন্য শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু মাইকিং করার পর শত্রুরা আত্মসমর্পণের বিষয়টিকে উড়িয়ে দেয়। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদিমনগরের দিকে ফিরে যেতে হয়। ওই দিন কদমতলী এলাকায় ঘটে আরেক ঘটনা। একটি ইটখোলায় থেকে যাওয়া ২১ জন পাকিস্তানি সৈন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন ৩৫ জনের মিত্র বাহিনীর একটি দল। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ওইদিন মোকাবেলা করেছিলেন শশত্রুদের। সেদিনের অপারেশনে নেতৃত্ব দেন রানা নামে এক ভারতীয় সুবেদার। প্রায় ৯ ঘণ্টা সম্মুখ যুদ্ধের পর নিরুপায় হয়ে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়। এরপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়।
মাছিমপুর থেকে নিক্ষিপ্ত একটি শক্তিশালী মর্টার এসে আঘাত করে সুবেদার রানাকে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিহত হন। আহত হন মিত্র বাহিনীর আরও দুই সদস্য। তবে, তাদের নাম সেদিন জানা ছিলো না কারো। পরে ১৪ ডিসেম্বর সরকারি কলেজের আশপাশ থেকে শত্রæরা তাদের অবস্থান তুলে নেয়। ইতোমধ্যে ‘জেড’ ফোর্স’র সেনারা এমসি কলেজ সংলগ্ন আলুরতলে সরকারি দুগ্ধ খামারের কাছে পৌঁছে যান। তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা সবদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ওইদিন সন্ধ্যায় চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর জওয়ানরা দলবদ্ধভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে সিলেট শহর। পাড়া-মহল্লা, অলিগলি পর্যন্ত এই খবর পৌঁছে যায়।
পরদিন ১৫ ডিসেম্বর সকালে সকল বয়সী মুক্তিপাগল মানুষের ঢল নামে সিলেট শহরে। তাদেরকে ঘিরে ভিড় জমে পথে পথে। ঘড়িতে তখনো ১২টা হয়নি। শহরবাসী মাইকের মাধ্যমে উচ্ছাস ভরা কন্ঠে গোটা সিলেটে প্রচার করতে থাকেন ‘সিলেট হানাদার মুক্ত’ সিলেট হানাদার মুক্ত’। সেই থেকে সিলেট মুক্ত দিবস পালিত হয়ে আসছে।
সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর্জা জামাল পাশা বলেন, ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর মাছিমপুরে ভারতীয় ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর উপস্থিতিতে জোড ফোর্স, এম ফোর্স, এফ ফোর্স ও মিত্রবাহিনীর একটি যৌথসভা হয়। এর পর ১৬ নভেম্বর তৎক্ষালিন মেজর জিয়াউর রহমান সিলেটে এসে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট হয়ে জেড ফোর্সের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে সুনামগঞ্জে যান।
তিনি আরো বলেন, ১৭ নভেম্বর কানাইঘাটে লোভাছড়ায় পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে আমাদের সম্মূখ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে আমার নেতৃত্বাধীন পাশা কোম্পানীও অংশগ্রহন হরে। লোভাছড়ার যুদ্ধে আমাদের ৪/৫ জন মুক্তিযযোদ্ধা শহীদ হন।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিজস্ব প্রতিবেদক 








