জামায়াতের বাছাই করা নীতি ও বিপজ্জনক রাজনীতি
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৮ PM

জামায়াতের বাছাই করা নীতি ও বিপজ্জনক রাজনীতি

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯/০৭/২০২৬ ১০:৩৪:১৩ AM

জামায়াতের বাছাই করা নীতি ও বিপজ্জনক রাজনীতি


সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার শাহরিয়ার ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তার কথিত মন্তব্য “ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলো ‘দখলকৃত দেশ’ এবং সেখানকার খ্রিস্টানদের স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেওয়া উচিত” শুধু উসকানিমূলকই নয়, এটি রাজনৈতিকভাবেও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহ ও জাতিগত সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে এসব রাজ্য ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। এগুলোকে ‘দখলকৃত স্বাধীন দেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করা একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক দাবি, যা বাংলাদেশের স্বার্থ ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে, নির্বিচারে নিপীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ করতে হলে সাধারণ বক্তব্য দিয়ে নয়, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করার প্রয়োজন হয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো। এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে যা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ায় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।

জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক শাসনকে সমর্থন করেছিল ও বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। পরবর্তীতে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হয়। ওই বিচার নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করা জামায়াতের ইতিহাসের একটি অস্বীকারযোগ্য অধ্যায়।

এখানে আরেকটি বৈপরীত্য রয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতার বিরোধিতা করে আসছে এবং সবসময়ই নিজের ভৌগোলিক অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সেই নীতির সঙ্গে প্রতিবেশী একটি দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে উৎসাহিত করার আহ্বান কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বেছে বেছে নীতি গ্রহণ করা চলে না।

সরকার গঠনের স্বপ্ন লালনকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উপলব্ধি করা উচিত যে জনগণের সামনে উচ্চারিত প্রতিটি বক্তব্যের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিণতি রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদকে উৎসাহিত করে এমন বক্তব্য বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনের দিকে নিয়ে যায় না; বরং তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ইতিবাচক পরিবর্তন হতে দেয় না । তা অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়।

বিরোধী রাজনীতি কখনোই কল্যাণমূলক রাষ্ট্রপরিচালনার সন্নিকটে উসকানিমূলক হতে পারে না। বাংলাদেশের দরকার এমন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব, যারা কূটনীতি, তথ্যভিত্তিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আঞ্চলিক বাস্তবতার মোকাবিলা করবেন। আর এটি কোনো বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে হয় না, যা দেশের সীমানার বাইরে বিভেদ ও অস্থিরতাকে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

জামায়াত যদি নিজেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে তাকে নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিচক্ষণতা এবং জনপরিসরে দায়িত্বশীল আচরণের প্রমাণ দিতে হবে। যে দলটি একসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের জন্য অন্য দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতিকে উৎসাহিত করার মতো অবস্থান গ্রহণের আগে বিশেষ সতর্কতা ও সংযম প্রদর্শন করা খুবই প্রয়োজন।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর