ফলকে সাইফুর রহমানের নাম থাকায় ১৭ বছরেও মেলেনি এমপিওভুক্তি
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০০ PM

ফলকে সাইফুর রহমানের নাম থাকায় ১৭ বছরেও মেলেনি এমপিওভুক্তি

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০/০২/২০২৫ ১০:১৫:১৭ AM

ফলকে সাইফুর রহমানের নাম থাকায় ১৭ বছরেও মেলেনি এমপিওভুক্তি


প্রতিষ্ঠার ১৭ বছরেও সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ‘শ্রীমঙ্গল রেসিডেন্সিয়াল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। এমপিওভুক্তিসহ নানা সরকারি সুবিধার অভাবে নারীশিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে নির্মিত প্রতিষ্ঠানটির এখন বেহাল দশা।

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। তবে আগের চার বছর এটি ছিল চা শ্রমিকদের জন্য নির্মিত ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। এর অবকাঠামোও সেভাবেই নির্মিত। এক পর্যায়ে চিঠি চালাচালির মাধ্যমে এক প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যায়।

বিএনপি সরকারের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান পাঁচ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আর তেমন কোনো উন্নতির মুখ দেখেনি প্রতিষ্ঠানটি। হয়নি এমপিওভুক্তও।

কলেজের নিচতলার কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ ঘুরে দেখা যায়, ক্লাসে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষিকারা। উপরতলার বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবহারের অভাবে কক্ষের আসবাবপত্র, কাঠের দরজা-জানালাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  

এই ক্যাম্পাসে রয়েছে ছয়টি পৃথক পৃথক আবাসিক ভবন, সুবিশাল খেলার মাঠ, চারটি অফিসকক্ষ, ২০টি শ্রেণিকক্ষ, দুটি শিক্ষক মিলনায়তন, দুটি ছাত্রী মিলনায়তন, একটি কনফারেন্স রুম, অডিটোরিয়াম ও ডাইনিং হল। রয়েছে পৃথক ক্যান্টিন ভবনও। সেইসঙ্গে রয়েছে একটি কম্পিউটার ল্যাব এবং ছাত্রীদের খেলাধুলার সরঞ্জাম।  

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক অসিত কুমার পাল বলেন, ২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কলেজটির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এই প্রতিষ্ঠানে নয়জন শিক্ষক, ১৭ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করে।

নিয়োগের প্রাথমিক শর্ত ছিল, যোগদানের তারিখ থেকে তারা চার বছর পর্যন্ত সরকার প্রদত্ত প্রচলিত এমপিও পদ্ধতিতে বেতনভাতা পাবেন এবং ওই সময় পার হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে বেতনভাতা পাবেন। কিন্তু ডিসেম্বরে সরকার পরিবর্তনের ফলে আর কিছুই হয়নি।    

অসিত কুমার পাল জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে চা শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ছিল। এটি তৈরি করেছিল আন্তর্জাতিক লেবার অরগানাইজেশন (আইএলও)। কিন্তু পরে শ্রম মন্ত্রণালয় এটি আইএলওর কাছ থেকে আর নেয়নি। কিছুদিন হাসপাতাল হিসেবে চললেও পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের কথা উল্লেখ করে অধ্যক্ষ বলেন, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান হাসপাতালটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরির পরিকল্পনা নেন। পরে চার কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে হাসপাতালটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়।

তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণে শুরুতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতনভাতা আটকে যায়। ফলে শিক্ষকরা হতাশ হয়ে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যান। সেই সময় থেকেই খণ্ডকালীন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারী নিয়ে কোনোক্রমে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।  

অধ্যক্ষ বলেন, আমি ২০০৯ সালে এখানে যোগ দিই। তখন মোট শিক্ষার্থী ছিল ৮২ জন। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে সাড়ে ৩০০ জনের বেশি ছাত্রী রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে যে অবকাঠামো রয়েছে তা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এ প্রতিষ্ঠানটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি।

এমপিওভুক্ত করতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুমোদন এবং সার্বিক সহযোগিতার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু কলেজের সামনে ফলকে সাবেক মন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নাম থাকায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো সহযোগিতাই করেননি বলে জানান তিনি।

অধ্যক্ষ বলেন, উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে আগের মতো হাসপাতাল করতে অনেক চেষ্টা করেছিলেন। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সুধীমহলে অনেক সমালোচনা ও আন্দোলন হয়েছিল।

শিক্ষক সংকটের কথা উল্লেখ করে অধ্যক্ষ বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে একজন সহকারী শিক্ষকসহ রয়েছেন ১৩ জন প্রভাষক। এ ছাড়া একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, একজন নৈশপ্রহরী ও একজন পরিচ্ছন্নকর্মী রয়েছেন। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিষ্ঠানটি চালানো খুবই কঠিন হয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা পেলে এ কলেজটি হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারত। এলাকার দরিদ্র মেয়েরা অন্তত পড়ালেখার সুযোগ থেকে আর বঞ্চিত হতো না।

যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, শ্রীমঙ্গল রেসিডেন্সিয়াল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিভিন্ন সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসককে জানানোর পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।  

তিনি বলেন, এই কলেজের ভেতরের পরিত্যক্ত ভবনে একটি কারিগরি বিদ্যালয় চালু করার প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। এটি বাস্তবায়িত হলে কলেজটিতে তার শিক্ষাভিক্তিক প্রাণচাঞ্চল্য আরও বাড়বে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর