ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে সিলেটের জলাবন রাতারগুল অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত একটি পর্যটন স্থান। বছরের প্রতিটি সময়—বিশেষ করে বর্ষাকালে পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এ বনভূমি। কিন্তু পর্যটকদের অসচেতনতা আর নির্বিচারে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে দেশের একমাত্র স্বচ্ছ মিঠাপানির এই জলাবন।
সহ-ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই জলাবনের জীববৈচিত্র রক্ষায় প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখানে প্রতিনিয়তই জমতে থাকে প্লাস্টিক।
২০২৩ সালের অক্টোবরে রাতারগুল সমাজ কল্যান পরিষদের উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে রাতারগুল থেকে পাঁচ বস্তা প্লাস্টিক, জাল ও বোতলজাত বর্জ্য উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালের ২১ মে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসনের আহবানে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা রাতারগুলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেন।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে অবস্থিত রাতারগুল জলাবন (সোয়াম্প ফরেস্ট) হওয়ায় ১৯৭৩ সালে সংরক্ষিত ঘোষণা করে বন বিভাগ। নদী ও হাওরবেষ্টিত ৫০৪ দশমিক ৫০ একর আয়তনের পুরো এলাকা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অনেকটা অজানা ছিল।
‘রাতারগুল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য স্থাপন ও উন্নয়ন’ প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা হিজল-করচ-বরুণগাছের পাশাপাশি বেত, ইকরা, খাগড়া, মুরতা ও শণজাতীয় গাছ রাতারগুলকে জলাবন হিসেবে অনন্য করেছে।
সংরক্ষিত এ বনে ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সঙ্গে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি ও ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এভাবে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার চলতে থাকলে রাতারগুলের মাছ, পাখি ও সরীসৃপসহ জীববৈচিত্র ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন অপচনশীল বর্জ্য। পর্যটনকেন্দ্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক মাইক্রো-প্লাস্টিকে পরিণত হয়ে পানিতে মিশে যায়। ফলে মাছের পেটেও এখন প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। এতে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্লাস্টিক ঢুকছে এবং নানা রোগ-শোক দেখা দিচ্ছে। পর্যটকদের সচেতন হতে হবে– পরিবেশের প্রতি আরও সংবেদনশীন হতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশের পর পর্যটকরা যাতে এসব ক্ষতিকারক পদার্থ না ফেলতে পারেন সেজন্য সরকার বা বিভিন্ন সংস্থাকে মনিটরিং করা জরুরি।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেট জেলার সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, পর্যটকরা যখনই কোন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানে আসেন, সে স্থানটি আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। পর্যটন বিষয়ে ন্যুনতম শিক্ষা ছাড়া দেশের হাজার হাজার মানুষ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ঘুরে বেড়ান। এ শিক্ষার অভাবে তারা উচ্চস্বরে শব্দ সৃষ্টি করেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ করেন। এ বিষয়ে একটা সার্বিক সচেতনতামূলক প্রচারণা খুব জরুরি।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানান, ছুটির দিনে ১০-১৫ হাজার পর্যটকসহ প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ হাজার পর্যটক রাতারগুলে আসেন। প্রতিটি নৌকায় ময়লা ফেলার জন্য ঝুড়ি রাখা আছে। সাধারণত পর্যটকরা সেগুলোই ব্যবহার করেন। তবে ভুলবশত কেউ যদি পানিতে ময়লা ফেলেন, সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌকার মাঝিরা তা সংগ্রহ করেন। এছাড়া পর্যটন এলাকায় সচেতনতার জন্য সাইনবোর্ড দেওয়া আছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি









