প্রাকৃতিক হাওরের বিশেষ ফাঁদ ‘কিরণমালা’
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৭:৫৬ AM

প্রাকৃতিক হাওরের বিশেষ ফাঁদ ‘কিরণমালা’

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭/১১/২০২৫ ১১:৩৯:৪০ AM

প্রাকৃতিক হাওরের বিশেষ ফাঁদ ‘কিরণমালা’


হাওরপাড়ের বিকেলটা চঞ্চলায় ভরা। সূর্য ডোবার আগে থেকেই এ এলাকার গ্রামগুলোতে শুরু হয়ে যায় ভিন্ন এক প্রকারের ব্যস্ততা। একের পর এক নৌকা ভেসে যেতে থাকে হাওরের বুকে। কেউ সারা রাত ভেসে থাকেন পানিতে, কেউ আবার ফাঁদ পেতে রেখে সন্ধ্যার পর ফিরে আসেন বাড়ি। তবে ভোর হওয়ার আগেই আবার ছুটে যান ফাঁদ সংগ্রহ করতে। এই ব্যস্ততার মূল কারণ চিংড়ি। যাকে স্থানীয় লোকজন বলেন ‘ইছা’ মাছ বলা হয়।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওড়পাড়ের কাদিপুর আর রাজনগর উপজেলার অন্তেহরি গ্রামের শতাধিক পরিবার এই হাওরে চিংড়ি ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁদের প্রধান ভরসা ‘কিরণমালা’ নামে পরিচিত এক বিশেষ ফাঁদ। প্লাস্টিকের তৈরি এই ফাঁদে টোপ দেওয়া থাকে মাছের খাদ্য। টোপের আকর্ষণে চিংড়ি ঢুকে পড়ে ফাঁদের ভেতরে। তারা নৌকা বোঝাই করে এই ফাঁদ নিয়ে হাওরে যান। তবে এখানে অন্য মাছশিকারিরাও আছেন, যারা জাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন।

সময়ের সঙ্গে হাওরে মাছের পরিমাণ কমছে। এতে করে বিপাকে পড়েছেন সেখানকার মৎস্যজীবীরা। আগের মতো এখন বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি-বাদল হয় না। হাওরে পানির উপস্থিতিও কমে গেছে। ফলে দিন দিন মাছও কমছে। এ ধারাবাহিকতায় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘি হাওরের উপরাঞ্চলে মিলছে না পানির দেখা। ফলে এবারে কাউয়াদিঘি হাওরে মাছের উৎপাদন কম হয়েছে।

এদিকে ওই হাওরের গভীর অঞ্চলে বেড়জাল দিয়ে মৎস্যজীবীরা ছোট-বড় মাছ ধরছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সাম্প্রতিক সময়ে জেলেরা মাছ ধরার পদ্ধতি পাল্টে ফেলেছেন। প্লাস্টিকের বোতল সদৃশ কিছুর অগ্রভাগে জালি ধরনের ফাঁদ সৃষ্টি করা হয় এখন মাছ ধরতে। বোতলের ভেতরে শামুক-ঝিনুকের আবরণ ফেলে মাংস ও বাজার থেকে কেনা দানাদার ফিড দিয়ে বোতল বেঁধে সারি ধরে ডুবিয়ে রাখা হয়। এভাবে এখন কাউয়াদিঘি হাওরের উপরিভাগে হাওড়পাড়ের রক্তা, অন্তেহরি, আমিরপুর, ইসলামপুর, আমিরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ মাছ ধরার বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

মৎস্যজীবী নন্দলাল বিশ্বাস জানান, কিরণমালা নামের এই ফাঁদ মান ভেদে প্রতি শ’ চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দরে শ্রীমঙ্গল থেকে কিনে আনতে হয়। এরপর সারিবদ্ধভাবে সেগুলো হাওরের জলে স্থাপন করতে হয়। সব মিলিয়ে একশ কিরণমালার পেছনে পাঁচ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়।

কিরণমালা ব্যবহার করা মাছ শিকারি কৃপেশ সরকার কথা প্রসঙ্গে জানালেন, ৬০০টি কিরণমালা ফাঁদ আছে তার। ঢাকার বাজার থেকে কিনেছেন। ১০০ পটের (ফাঁদ) দাম চার হাজার টাকা। প্রতিদিন এসব ফাঁদে দুই থেকে চার কেজি পর্যন্ত চিংড়ি ধরা পড়ে। কখনো আরও বেশি। পাইকারি দরে প্রতি কেজি চিংড়ি বিক্রি হয় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। 

অপর মৎস্য শিকারি হিরালাল সরকার জানান, মাছ ধরা তাঁদের পেশা। মাছ ধরেই তাঁদের সংসার চলে। প্রতিদিন শতাধিক নৌকা হাওরে নামে শুধু চিংড়ির টোপ ফেলতে। আষাঢ় থেকে কার্তিক-অগ্রহায়ণ পর্যন্ত এভাবেই চলে কিরণমালায় চিংড়ি শিকার। তবে বর্ষা মৌসুমে সংসার চলে ভালোভাবে। শুকনা মৌসুমে ইজারার কারণে মাছ ধরতে পারেন না, তাই রোজগারও থাকে না।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর