চা শ্রমিকদের ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ০৮:৫৭ PM

চা শ্রমিকদের ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/০৫/২০২৬ ০৭:৪১:৪৩ PM

চা শ্রমিকদের ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি


সিলেটের ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের ১০৫তম বার্ষিকীতে দিবসটির রাষ্টীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে চা শ্রমিকরা।

বুধবার সকালে সিলেট বিভাগের সব চা বাগানে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট ভ্যালির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রাজু গোয়ালা।

পরে শ্রমিক নেতা রাজু বলেন, “চা শ্রমিকরা ভূমির অধিকার, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমরা দাবি করছি ঐতিহাসিক ২০ মে দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘চা শ্রমিক দিবস’ ঘোষণা করে সবেতন ছুটি প্রদান করা হোক। একইসঙ্গে ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।”

চা শ্রমিক সুনীল লোহার বলেন, “আমাদের পূর্ব পুরুষদের ‘গাছ হিলেগা-রুপিয়া মিলেগা’ এই প্রলোভন দেখিয়ে এ দেশে নিয়ে আসা হয়েছিল। অসহায় মানুষদের একদিন স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। দারিদ্র্য আর অনাহারের সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলো বিশ্বাস করেছিল সেই মিথ্যা স্বপ্ন। কিন্তু বুকভরা আশা নিয়ে প্রতারিত হতে হয়েছিল অজানা এক ভূখণ্ডে।’’

তিনি বলেন, “কিন্তু শ্রমিকেরা ব্রিটিশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে যখন তারা নিজ দেশে চলে যেতে চেয়েছিলেন, ওই সময় তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। শত-শত চা শ্রমিককে হত্যা করে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

“অথচ ১০৫ বছরেও আমাদের পূর্বপুরুষদের হত্যাকাণ্ডের এই দিনটিতে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমরা চাই দেশে সরকারিভাবে এই দিনটি পালন করা হোক।”

লাক্কাতুরা চা শ্রমিক ফেডারেশনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

এদিকে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট জেলা শাখার উদ্যোগে ঐতিহাসিক এ দিবস উপলক্ষে লাক্কাতুরা চা বাগানে মিছিল-সমাবেশ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়।

বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় লাক্কাতুরা চা বাগানে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শেষে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

চা শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট জেলা আহ্বায়ক হৃদয় লোহারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- বাসদ সিলেট জেলা আহ্বায়ক আবু জাফর, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রণব জ্যোতি পাল, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট জেলার জরিনা বেগম, শান্ত লোহার, আয়েশা বেগম, রত্না, দুর্জয় লোহার, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের দপ্তর সম্পাদক মাহফুজ আহমদ প্রমুখ।

লাক্কাতুরা চা বাগানের চা শ্রমিক কলবতি লোহার বলেন, “এত বছর চলে গেলেও আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি; কবে হবে তা বুঝতে পারছি না। শ্রমিকেরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

“আমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়াতে পারি না। সন্তানদের মুখে মাছ-মাংস তুলে দিতে পারি না। শ্রমিকদের জীবনমান কবে উন্নত হবে বলেন। পূর্বপুরুষরা খেয়ে না খেয়ে মারা গেছে, আমরাও এভাবে যাচ্ছি। সরকার চা শ্রমিকদের উন্নয়নে কিছু করুক এটাই চাই।’’

হৃদয় লোহার বলেন, আমাদের দাবি ২০ মে চা শ্রমিক দিবস হিসেবে স্ববেতনে ছুটি ঘোষণা করা, দৈনিক নগদ মজুরি ৬ শত টাকা নির্ধারণ করা, বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ, সামাজিক সুরক্ষাসহ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। চা শ্রমিকদের মুক্তির আন্দোলনের স্মারক ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানানো হয় সমাবেশে।

ব্রিটিশ বাগান মালিকদের প্রতারণা-বঞ্চনা-শোষণের বিরুদ্ধে ১৯২১ সালের ২০ মে গড়ে উঠে এক ঐতিহাসিক আন্দোলন, যা ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন নামে পরিচিত।

ব্রিটিশদের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে শ্রমিকনেতা পন্ডিত গঙ্গা দয়াল দিক্ষিত, দেওশরন ত্রিপাঠী, হরিচরণ প্রমুখ নেতাদের নেতৃত্বে আসাম ও কাছাড় জেলার প্রায় ৩০ হাজার চা শ্রমিক করিমগঞ্জ রেল স্টেশনে সমবেত হয়ে রেল গাড়িতে উঠতে না পেরে রেল লাইন ধরে চাঁদপুর স্টিমার ঘাটের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করেন।

যখন তারা চাঁদপুর স্টিমারঘাটে পৌঁছায়, তখন ব্রিটিশ মালিকদের নিদের্শে আসাম রাইফেলস্ এর গোর্খা বাহিনী এই অসহায় চা শ্রমিকদের উপর হামলে পড়ে এবং মেতে ওঠে নির্মম হত্যাযজ্ঞে।

তাদের ওপর গুলি চালিয়ে শত শত শ্রমিককে হত্যা করে। শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এই আন্দোলন তখন একটি সর্বভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনে রূপ ধারণ করে। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে চাঁদপুর ও লাকসাম জংশনের রেল শ্রমিকেরা ২১ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন।

২৪ মে থেকে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিক ও ২৮ মে থেকে স্টিমার ধর্মঘট চলতে থাকে। আসাম বেঙ্গল রেল শ্রমিকেরা তিন মাস এবং স্টিমার শ্রমিকেরা ছয় সপ্তাহ ধর্মঘট করেছিলেন। এই ধর্মঘট ও দেশজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফলে চা বাগানের ব্রিটিশ মালিকেরা শ্রমিকদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর ২০ মে ‘চা শ্রমিক দিবস’ পালন করেন শ্রমিকরা।

দিবসটি উপলক্ষে তারাপুর, খাদিম চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়।

আজকের সিলেট/এপি

সিলেটজুড়ে


মহানগর