প্রথমে রবিশস্য চাষে কেঁচো সারের ব্যবহার শুরু হলেও ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সব ধরনের চাষাবাদে। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে এখন বালাগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা ঝুঁকছেন কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে।
সারা দেশে বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে কেঁচো সার উৎপাদনে যুক্ত হচ্ছেন এবং নিজেদের পরিশ্রমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বালাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত দেওয়ানবাজার ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম সুলতানপুরের কৃষাণী হোসনা বেগম নিজ বাড়ির উঠানে শুরু করেন কেঁচো সার উৎপাদন।
হোসনা বেগম জানান, অল্প পুঁজিতেই এই কাজ শুরু করা যায়। স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে ছোট একটি ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট স্থাপন করেন তিনি। শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করলেও এখন নিয়মিতভাবে সার উৎপাদন করছেন এবং ভালো লাভ হচ্ছে। বর্তমানে তিনি প্রতি কেজি কেঁচো সার ২০ টাকা দরে বিক্রি করেন, যেখানে উৎপাদন খরচ মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা।
হোসনা বেগম বলেন, এই সার ব্যবহার করলে মাটির গুণগত মান বাড়ে, ফসল ভালো হয় আর রাসায়নিক সার কম লাগে। এতে কৃষকের খরচও কমে।
এখন তাঁর কাছ উৎপাদিত কেঁচো সার বিভিন্ন বাগানি ও সবজি চাষি পাইকারি ও খুচরা মূল্যে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের বিভিন্ন প্রকল্পে এই সার কৃষকদের মাঝে দেওয়া হয়।
হোসনা বেগম দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের একজন নারী উদ্যোক্তা। কেঁচো সার উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি কৃষি প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয় তাঁর। সেখানে কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। তিনি কেঁচো সার উৎপাদনের জন্য ২০২৪ সালে উপজেলায় শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তার পুরস্কার লাভ করেন।
হোসনা বেগম আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন প্রদর্শনী পান, যেখানে ২টি চেম্বার ও ৬টি রিং দেওয়া হয়। প্রতিটি রিংয়ে ১০০ থেকে ১২০ কেজি পচা গোবর, তরিতরকারির ফেলে দেওয়া অংশ, পাকা কলার খোসা ও কৃষি বিভাগ থেকে বিনামূল্যে পাওয়া পাঁচশ গ্রাম কেঁচো দিয়ে সার তৈরি শুরু করেন হোসনা। এতে তার খরচ পড়ে মাত্র তিনশ টাকা। ৪০ দিন পর প্রতিটি রিংয়ে ৪৫ কেজি করে কেঁচো সার তৈরি হয়। প্রতি কেজি কেঁচো সার বিক্রি হয় ১৮ টাকা থেকে ২০ টাকায়। ফলে ছয়টি রিং থেকে উৎপাদিত কেঁচো সার বিক্রি করে তিনি পেয়েছিলেন পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো। প্রতি তিন মাস অন্তর কেঁচোর বংশবৃদ্ধি হয়। এ কারণে নতুন করে কেঁচো কিনতে হয় না।
হোসনা বেগম জানান, কেঁচো সার তৈরিতে গরু-ছাগল অথবা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও নাড়িভুঁড়ির প্রয়োজন হয়। এসব নিজে এবং তার পরিবারের সদস্যরা মিলে জোগাড় করেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, হোসনা বেগমের তৈরি সারের মান ভালো হওয়ায় আশপাশের গ্রামের কৃষকরা তাঁর কাছ থেকেই সার সংগ্রহ করেন। এতে একদিকে যেমন হোসনার আয়ের পথ উন্মুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে কৃষকরাও উপকৃত হচ্ছেন।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে, মাটিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ালে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। ভার্মি কম্পোস্ট মাটিকে নরম করে, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং উপকারী অনুজীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, কেঁচো সারে থাকে ৮৮.৩২ ভাগ জৈব পদার্থ, ১.৫৭ ভাগ নাইট্রোজেন, ১.২৬ ভাগ বোরন, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম, যা গাছের পুষ্টি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে ভ‚মির উর্বরতা ধীরে ধীরে কমে যায়।
তাই কৃষি কর্মকর্তারা মনে করেন, এখন থেকেই কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে মাটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
বালাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান বলেন, কৃষকরা বিভিন্ন ফসলে রাসায়নিক সার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। এতে জমির উর্বরতা শক্তি ও জৈবিক উপাদান কমে যাচ্ছে। যার ফলে ফলনও কমে যাচ্ছে। কেঁচো সার ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা হয়। উর্বরতাও বাড়ে। এতে কৃষকেরা লাভবান হবেন। অন্যদিকে রাসায়নিকমুক্ত ফসল উৎপাদন হবে।
তিনি আরও বলেন, হোসনা বেগমের মতো অন্যান্য নারীরা এই কাজে অংশ নিয়ে নিজেদের চাহিদা পূরণ এবং প্রতিবেশী অন্য কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করে স্বাবলম্বী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
বালাগঞ্জ প্রতিনিধি 








