জৈন্তাপুর উপজেলায় ছয়টি ইউনিয়নে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক সবজি চাষীদের নিকট ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মালচিং পদ্ধতিতে সবজির আবাদ। তুলনামূলক কম পরিশ্রম, রোগ বালাই মুক্ত, আগাছা ও পোকামাকড় হতে নিরাপদ চারা রক্ষা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হতে মালচিং পেপার সহ আনুষাঙ্গিক বীজ,সার ও কীটনাশকের সহজলভ্যতার কারণে এই পদ্ধতিতে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে কৃষকদের মাঝে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জৈন্তাপুর হতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে খন্ড খন্ড ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সবজী চাষীরা মালচিং পদ্ধতিতে ফসল আবাদ করছেন। উপজেলার অন্যতম কৃষি সম্মৃদ্ধ ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিত ৩ নং চারিকাঠা ইউনিয়নের পূর্ব ভিত্রিখেল গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষক মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে সাবলম্বী হয়েছে।
কথা হয় এমনই এক সফল কৃষক শরীফ উদ্দিনের সাথে। ভিত্রিখেল পূর্ব গ্রামের শরীফ উদ্দিন ২০২০ সাল থেকে মালচিং পদ্ধতিতে সবজির চাষ করে আসছেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকাকালীন ইউটিউবে আধুনিক কৃষি চাষের প্রতিবেদন দেখে তার মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষের আগ্রহ জন্মে। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। মাত্র বিশ শতাংশ জমিতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হতে মালচিং পেপার সহ আনুষাঙ্গিক সবকিছু সংগ্রহ করে শুরু করেন সবজীর আবাদ। প্রতি বছর একই বেডে ৩/৪ প্রজাতির মৌসুমী সবজি চাষ করে তিনি ভালো দামে বিক্রি করতে পারছেন। চলতি মৌসুমে একই বেডে মঙ্গলরাজা জাতের টমেটো চাষ করেন। গত নভেম্বরে রোপন করা টমেটো গাছে ইতিমধ্যে ফলন এসেছে। আগামী জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ফসল বিক্রি শুরু করবেন। এতে করে চারা রোপন, পরিচর্যা সহ যাবতীয় খরচ বাবদ তার ব্যায় হয়েছে আনুমানিক ২০ হাজার টাকা সমপরিমাণ। তিনি আশা করছেন তার রোপিত ১২ শ চারা হতে ১৫০ মণ টমেটো উৎপাদন হবে বলে তিনি আশাবাদী যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা।
একই গ্রামের আরেক কৃষক সুবল বর্মণ তিনিও ২০ শতাংশ জমিতে মালচিং পদ্ধতি আইসক্রিম গ্রীণ জাতের শশা চাষ করেছেন। চলতি ডিসেম্বর মাসের শুরুতে ২০ শতক জমিতে আনুমানিক ২০ হাজার টাকা ব্যায়ে ২ হাজার পিছ চারা তিনি রোপন করেন।
তিনি জানান, আগামী ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ১২০-২৫ মণ শশা উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন। এ সময়টা পবিত্র রমজান মাস হওয়ায় শশার ভালো দাম থাকে। যার ফলে চলতি মৌসুমে তিনি দেড় লক্ষ টাকার শশা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদী। এদিকে আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে আরেক সবজি চাষি নুরুল ইসলাম। তিনি চলতি মৌসুমে ২০ শতাংশ জমিতে টিয়া জাতের ৬০০ পিস করোলার বীজ বোপন করেছেন। এতে তার শ্রমিক খরচ বাবদ ১৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ২০ শতক জমি হতে উৎপাদিত ৭০-৭৫ মণ করোলা বিক্রি করতে পারবেন যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬৫-৭০ টাকা সমপরিমাণ। এ দিকে মালচিং পদ্ধতিতে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
উপজেলা উপ- সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সালেহ আহমদ বলেন, মালচিং একটি আধুনিক কৃষি পদ্ধতি। এটি মাটির আদ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে। এতে করে মালচিং পদ্ধতিতে সবজির জমিতে অতিরিক্ত সার দিতে হয় না যার কারনে অপচয় কম হয়। পাশাপাশি মালচিং পদ্ধতিতে সবজির চাষে ফসলের মান ভালো থাকে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়।
তিনি আরো বলেন, মালচিং পদ্ধতিতে উপযোগী চাষযোগ্য সবজি হলো টমেটো, শশা,করোলা,বেগুন,ঝিঙা,কাঁচা মরিচ, নাগা মরিচ। এই ফসলগুলো মাটির আদ্রতা বেশী পাওয়ায় ও আগাছা কম হওয়ায় ভালো উৎপাদন হয়।এ বিষয়ে আরো কথা হয় উপ- সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অরুণাংশ দাসের সাথে।
তিনি বলেন, মালচিং পেপার দেখতে পলিথিনের মত হলেও এটি বিশেষ ভাবে তৈরী কৃষি ও পরিবেশ বান্ধব। এই সমস্ত উপকরণ কৃষকদের বাহিরের বাজার থেকে কিনতে হয় না বরং উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আনুসাঙ্গিক উপকরণ সহ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। যার ফলে মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষীরা উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে আসে।
তিনি আরো বলেন, দিন দিন চারিকাঠা ইউনিয়ন এলাকার কৃষকদের মাঝে মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে আগামী মৌসুমে নতুন করে মালচিং পদ্ধতিতে কৃষি চাষের আওতায় আনা হবে নতুন কৃষকদের।
জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ন দিলদার বলেন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জৈন্তাপুরের বাস্তবায়নে ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি এসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ) প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের কৃষকদের মাঝে মালচিং এর মাধ্যমে সবজি উৎপাদন প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপ- সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি সহ কৃষকদের মৌলিক ধারণা ও নির্দেশনা প্রদান করে আসছে।
তিনি আরো বলেন, জৈন্তাপুর উপজেলার প্রতি অংশ কৃষি জমিতে আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
জৈন্তাপুর প্রতিনিধি 








