কাঠ বা বেত নয়, এবার ঘরের সাজে জায়গা করে নিচ্ছে বাঁশের ফার্নিচার। নান্দনিক ডিজাইন, সাশ্রয়ী দাম ও পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের কারণে মৌলভীবাজারে দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদা। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই কুটিরশিল্প, যা ধীরে ধীরে সম্ভাবনাময় শিল্পখাতে রূপ নিচ্ছে।
স্থানীয় এলাকা থেকে সংগৃহীত বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় বাঁশের ফার্নিচার। এর চাহিদা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও স্থানীয়দের কাছে অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া বাঁশের ফার্নিচার দিয়ে বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্ট সাজানো হয়েছে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য।
সরেজমিনে জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের বড়চেগ গ্রামের আমির হোসেন সিরাজের বাঁশের ফার্নিচারের কারখানা ও বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সিরাজ নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন বাঁশ-বেতের আধুনিক ফার্নিচারের কারখানা। কাঠের ফার্নিচারের দোকানের সাথে পাল্লা দিয়ে বাঁশের দৃষ্টিনন্দন ফার্নিচার বানাচ্ছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শুরু করে মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করছেন তার তৈরি বাঁশের ফার্নিচার। নিজ বাড়িতে বাঁশ দিয়ে একটি দুতলা বাড়িও বানিয়েছেন।
জানা যায়, কমলগঞ্জের আমির হোসেন সিরাজ প্রায় দুই দশক আগে কয়েক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে বাঁশের ফার্নিচারের কারখানা শুরু করেন। এরপর থেকে আস্তে আস্তে তার ব্যবসা বড় হতে থাকে। ২০১৫ সালে মৌলভীবাজার জেলাকে পর্যটক জেলা ঘোষণা করার পর এর চাহিদা পর্যটকদের কাছেও বেড়ে যায়। বিশেষ করে রিসোর্ট ও বিভিন্ন হোটেল মালিকেরা বাঁশের ফার্নিচার অর্ডার করেন।
সিরাজ কুটির শিল্পের কর্মরত শিল্পীরা জানান, আমাদের এখানে আধুনিক ডিজাইনের সোফাসেট, খাট, ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, আলনা, ড্রেসিং টেবিল, দরজা, জানালা, ফুলের টব, রিডিং টেবিল, টেবিল ল্যাম্প, পেন স্ট্যান্ড বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়। এছাড় রিসোর্ট, কটেজের ফার্নিচার, হোটেল-রেস্টুরেন্ট-অফিসের ফার্নিচারসহ বিভিন্ন ধরনের চাহিদাসম্পন্ন আসবাবপত্র তৈরি করে দেওয়া হয়।
তারা আরও জানান, আমরা আকার অনুযায়ী প্রথমে বাঁশকে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হয়। শুকনোর পর পোকায় না ধরার জন্য ঔষধ দিয়ে আবার শুকাতে হয়। একটি বড় ফার্নিচার তৈরি করতে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ লেগে যায়। ছোট আইটেমগুলো সবচেয়ে বেশি চলে। বেশিরভাগ মানুষ শখের বসে এগুলো ক্রয় করে নিয়ে যায়। যতদিন যাচ্ছে মানুষ বাঁশের ফার্নিচারের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। আমাদের এখান থেকে অনেক বিদেশি পর্যটক এসে ছোট ছোট জিনিস ক্রয় করে নিয়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা লিয়াকত আলী জানান, সিরাজ তার একান্ত চেষ্টা ও কষ্ট করে এই শিল্প গড়ে তুলেছে। যত সময় যাচ্ছে বাঁশের ফার্নিচারের চাহিদা আরও বাড়ছে। সরকারিভাবে সহযোগিতা করলে এটাকে পূর্ণ একটা শিল্পে রূপান্তর করা যেতো। তিনি আরও বলেন, কাঠের তুলনায় বাঁশের ফার্নিচারের দাম কম। বিশেষ করে পর্যটন এলাকা থাকায় অনেক মানুষ এখানে ঘুড়তে আসেন এজন্য এই কুটিরশিল্প ভালোই চলছে।
সাফওয়ান আহমেদ নামে একজন ক্রেতা বলেন, আমি কিছুদিন আগে এখান থেকে বাচ্চার লেখাপড়ার জন্য একটা চেয়ার ও টেবিল নিয়েছি। এগুলো দেখতে অনেক সুন্দর। কাঠের বদলা নিয়েছে। কাঠের চেয়ে বাঁশের ফার্নিচারের দাম তুলনামূলক কম।
সিরাজ কুটিরশিল্প স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন সিরাজ বলেন, প্রায় ২৩ বছর আগে শখের বসে বাঁশের ফার্নিচারের কারখানা শুরু করে ছিলাম। প্রথম দিকে সারা কম পেলেও গত কয়েকবছর ধরে খুব ভালোই চলছে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রথমে বাঁশ সংগ্রহ করি আমরা। পরে এগুলো শুকিয়ে ফার্নিচার তৈরি করতে হয়। পর্যটন এলাকা থাকায় এখানে দেশি ক্রেতার পাশাপাশি অনেক বিদেশি ক্রেতা আসেন।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন ও কুরিয়ার সার্ভিসে বিক্রি হয় ফার্নিচার। কেউ কেউ আবার বিদেশেও পাঠান। বিদেশে এর প্রচুর চাহিদাও আছে। বাঁশের মধ্যে পোকায় না ধরার জন্য বিদেশ থেকে একধরনের তেল জাতীয় মেডিসিন ব্যবহার করা হয়। যার কারণে বাঁশের ফার্নিচারগুলো এখন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অতি সহজে নষ্ট হয় না। সহযোগিতা পেলে কুটিরশিল্পকে অনেক বড় করার ইচ্ছা রয়েছে আমার।
মৌলভীবাজার শিল্প নগরী কর্মকর্তা মো. মুনায়েম ওয়ায়েছ বলেন, সিরাজ ঋণের জন্য আবেদন করেছেন বিষয়টি আমরা দেখতেছি। এছাড়া যেসব উদ্যোক্তা ঋণের জন্য আবেদন করেছেন তাদের সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা তাদেরকে ঋণ দিচ্ছি। আমরা সর্বোচ্চ ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ দিতে পারি।
আজকের সিলেট/এপি
নিউজ ডেস্ক 








