সরকারি ঘোষণা, নজরদারি ও নানা উদ্যোগের পরও এবারও ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বাজারে প্রত্যাশিত দাম মেলেনি। রাজধানীর বিভিন্ন অস্থায়ী আড়ত ও পুরান ঢাকার পোস্তা এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে দেখা গেছে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিদের।
লবণ, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের লোকসান আরও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলডব্লিউজি সনদের অভাবে আন্তর্জাতিক বাজার হারানো, পরিবেশগত মান রক্ষা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি খরচ ও অর্থসংকটে ব্যবসায়ীরা, রপ্তানি না হওয়া, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব, সংরক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা, চাহিদার চেয়ে বেশি পশু, বাজার উন্মুক্ত করা, সচেতনতা বাড়াতে প্রচারনা বাড়ানো, কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ না করা এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ না থাকায় প্রতিবছরের মতো এবারও চামড়া বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে চামড়ার প্রকৃত হকদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া।
কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বাজারে এবারও দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও বিক্রেতাদের মধ্যে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দাম মূলত লবণযুক্ত চামড়ার জন্য হলেও বাস্তবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশি দাম দিতে পারছেন না।
একই সঙ্গে অর্থসংকট, বকেয়া অর্থ পরিশোধে জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্যের আধিপত্যকে দেশের চামড়া শিল্পের বড় সংকট হিসেবে দেখছেন তারা।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার প্রধান ক্রেতা ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরে যাওয়ায় শিল্পটি বড় সংকটে পড়েছে। বর্তমানে চীনা ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দেশের ট্যানারি খাত। তারা কম দামে চামড়া কিনছে এবং বাছাই করে পণ্য নেওয়ায় পুরো বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর সঙ্গে পরিবেশগত মান ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় চামড়ার ন্যায্যমূল্য মিলছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
কোরবানির ঈদ ও এর পরের দিন (২৮, ২৯ মে) রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, হাতিরপুল ও পোস্তা এলাকার চামড়া বাজার ঘুরে দেখা যায়, পিকআপ, অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশায় করে আনা চামড়া বিভিন্ন অস্থায়ী আড়তে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতি পিস গরুর চামড়া ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর আরও কমে যায়। অনেক জায়গায় ১৫০ টাকাতেও চামড়া বিক্রি হতে দেখা গেছে।
হাতিরপুল এলাকার একটি মাদরাসা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে আনা দুই ছাত্র বিকেল ৫টার দিকে ১০টি গরুর চামড়া প্রতি পিস ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেন। বিক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি চামড়ায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম পেয়েছেন তারা। পাশাপাশি ছাগলের চামড়া কেনায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহও ছিল খুব কম। কোথাও কোথাও রাস্তায় ছাগলের চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
পোস্তা এলাকায় লবণ ছাড়া ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়া ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা এবং বড় আকারের চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসাবে ঢাকায় ছোট আকারের একটি গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়ার দাম ১ হাজার ৩৬৫ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা এবং বড় আকারের চামড়ার দাম ২ হাজার থেকে প্রায় ৩ হাজার টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বাড়তি খরচ ও অর্থসংকটে ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, তা মূলত লবণযুক্ত চামড়ার জন্য। কিন্তু বাস্তবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার লবণের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেড়েছে। একটি চামড়া সংগ্রহ, লবণ দেওয়া, বহন ও সংরক্ষণ মিলিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। আবার অনেক চামড়া কাটা-ছেঁড়া বা ত্রুটিপূর্ণ থাকে, যেগুলো ট্যানারি মালিকেরা নিতে চান না।
মঞ্জুরুল হাসান বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া অর্থ আটকে থাকায় মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই। ফলে তারা চামড়া কিনতেও পারছেন না। তার দাবি, বর্তমানে খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে।
সরকারের কাছে প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বকেয়া অর্থ পরিশোধ এবং শিল্পের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সময়মতো টাকা দিতে না পারায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক নেতা আবতাফ খান বলেন, অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী কোরবানির রাতেই চামড়া বিক্রি করে চলে গেছেন। কেউ মুনাফা করেছেন, কেউ লোকসান গুনেছেন। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে টাকা কম আসলেও অনেক আড়তদার আংশিক পরিশোধ করেছেন। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানের বকেয়া এখনো রয়ে গেছে।
‘চীনা সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণ করছে বাজার
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখন অনেকটাই চীনা ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তারা কম দামে চামড়া কিনছে এবং বাছাই করে পণ্য নেওয়ায় পুরো বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চামড়া শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চীনা ব্যবসায়ীদের প্রভাবের কথাও তুলে ধরে মঞ্জুরুল হাসান। তার দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে যেতে পারেনি। চীনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা দাম নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের ট্যানারি মালিক বা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা মূল সিন্ডিকেট নয়, আসল নিয়ন্ত্রণ চীনা ব্যবসায়ীদের হাতে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে চামড়া রপ্তানি হয়ে চীনে প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর আবার সেই চামড়া দিয়ে তৈরি জুতা বা পণ্য ইউরোপের বাজারে যাচ্ছে। অথচ দেশে মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এই মূল্য সংযোজন দেশের ভেতরেই সম্ভব ছিল।
আবতাফ খানও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও চামড়ার দাম কম এবং ট্যানারি মালিকদের টাকা পরিশোধে দেরির অভিযোগ রয়েছে। তবে মূল সংকট আরও গভীরে। একসময় হাজীপুর ও হাজারীবাগকেন্দ্রিক ট্যানারি শিল্প ইতালি, স্পেন ও জাপানের বড় ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসা করত। এখন সেই বাজার প্রায় পুরোপুরি চীনা ক্রেতাদের হাতে চলে গেছে।
তিনি বলেন, চীনারা কম দামে চামড়া কিনছে। আবার তারা প্রায় ৫০ শতাংশ চামড়া বাছাই করে নিয়ে যায়। এতে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যত ভালো মানের চামড়াই হোক, কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় হারাচ্ছে বাজার
বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পারায় ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান ও কোরিয়ার বড় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আগে যে চামড়া ১ দশমিক ৫০ ডলারে বিক্রি হতো, এখন তা ৬০ থেকে ৭০ সেন্টে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা কমপ্লায়েন্ট না হওয়ায় বড় ক্রেতারা অন্য দেশে চলে গেছে।
শাহীন আহমেদের মতে, চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারলে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়া সহজ হবে এবং ইউরোপ-আমেরিকার বাজার আবার খুলবে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাক্টরিগুলোকে কমপ্লায়েন্ট হতে হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট পেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে আমরা আবারও চামড়া রপ্তানি করতে পারব।
ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা পেতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের সব কারখানা এখনো এ সনদ পায়নি। তিনি বলেন, যদি শিল্পাঞ্চলের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর হতো, তাহলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফলক হতে পারত।
আবতাফ খান বলেন, একসময় ইতালি, স্পেন ও জাপানের বড় ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স ঘাটতির কারণে সেই বাজার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
পরিবেশগত মান ও সংরক্ষণ ঘাটতির সমালোচনা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, দেশে চামড়া শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতার কারণে কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি আয় অর্জিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, কোরবানির সময় দ্রুত সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। আবার পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। আমরা আরও ভালো করতে পারতাম, যদি বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হতো এবং দ্রুত চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেত। বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণাগার ও দ্রুত সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এই খাত থেকে বছরে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব।
চামড়া শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, এখন চামড়া পুঁতে ফেলা হচ্ছে, পানিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে যে ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটি নষ্ট হয়ে গেছে।
ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, শুধু সিইটিপি সচল করাই যথেষ্ট নয়, পুরো শিল্পাঞ্চলে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য আশপাশের জলাশয় ও মাটিতে গিয়ে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। তাই পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত মানদণ্ড বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সংস্থার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থার মনিটরিং জরুরি বলে মত দেন তিনি।
চামড়া শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সংকুচিত হওয়ার পেছনে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ না করাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। আবতাফ খান বলেন, এখন সারা পৃথিবী কমপ্লায়েন্সে চলে গেছে। বিশেষ করে এলডব্লিউজির (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সার্টিফিকেশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু দেশের খুব কম ট্যানারি এই সনদ পেয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে চট্টগ্রামের একটি এবং যশোরের কয়েকটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। ঢাকায় এপেক্স ট্যানারি ইউনিট-২ ও এপেক্স ফুটওয়্যারসহ হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা এখনো এ সনদ পায়নি। ফলে ইউরোপীয় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন।
চামড়া শিল্পনগরীর সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মঞ্জুরুল হাসান। তার মতে, শুধু সিইটিপি চালু থাকলেই হবে না, এটি আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় মান নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজার পুরোপুরি ফিরে আসবে না। গার্মেন্টস খাতে যেমন মান উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে, চামড়া শিল্পেও তা করা সম্ভব।
সিইটিপি উন্নয়নে আশাবাদি সরকার
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী ও সিইটিপি প্রসঙ্গে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পরও অনেক ট্যানারি পুরোপুরি কার্যক্রম চালু করতে পারেনি। সিইটিপির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো সমাধান করে আরও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারলে দেশের সব চামড়া শিল্পায়নের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে সিইটিপির প্রকল্পগত সক্ষমতা দৈনিক ২৫ হাজার কিউবিক মিটার হলেও বাস্তবে তা ১৪ থেকে ১৮ হাজার কিউবিক মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
\বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) উন্নয়ন এবং বড় ট্যানারিগুলোতে পৃথক ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
তিনি বলেন, বর্তমানে সিইটিপির সক্ষমতা ১৫ থেকে ১৬ হাজার কিউবিক মিটার হলেও কোরবানির সময় বর্জ্যের পরিমাণ ৪০ হাজার কিউবিক মিটার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ কারণে সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
তিনি বলেন, শুধু সিইটিপির ওপর নির্ভর করলে আন্তর্জাতিক মান অর্জন সম্ভব নয়। প্রতিটি ট্যানারিতে প্রাথমিকভাবে বর্জ্য পরিশোধন, ক্রোম আলাদা করা ও স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এরপর অপেক্ষাকৃত ভালো মানের তরল বর্জ্য সিইটিপিতে এলে সেটি সহজে পরিশোধন করা সম্ভব হবে এবং এলডব্লিউজি সনদ পেতে সুবিধা হবে।
বর্তমানে শিল্পনগরীতে দুটি ট্যানারিতে পৃথক ইটিপি চালু রয়েছে বলে জানান তিনি। এগুলো হলো সদর ট্যানারি ও বেসমিনা। আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি আবেদন যাচাই চলছে।
একই সংকটের পুনরাবৃত্তি
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবীর ভূঁইয়া বলেন, প্রতি বছর একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর সমাধান আসছে না।
তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় নির্ধারিত দামে বেচাকেনা হয় না। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন গরিব ও এতিমখানাগুলো।
তিনি স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার, অস্থায়ী সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চাহিদার চেয়ে বেশি পশু
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ২২ লাখের বেশি পশু রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়, যার ৬০ শতাংশের বেশি আসে কোরবানির মৌসুমে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ গরুর চামড়া।
বাণিজ্যমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহারে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় সরকার। চামড়া যেন নষ্ট না হয় এবং দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পে যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যে সারাদেশে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করা হয়েছে। ঈদের আগে বাকি জুমায় দেশের সকল মসজিদে খতিব ও ইমামগণ যেন খুতবা ও বক্তব্যে চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরা, জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে মাদ্রাসা, এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বিভাগীয় কমিশনারদের বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন এবং জেলা প্রশাসকদের প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তদারকির নির্দেশ দেয়া হয়।
কাঁচা চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ১৭ কোটির অধিক টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা এবং জেলা পর্যায়ে ৭৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চামড়া সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হয়। টেলিভিশন, রেডিও, জাতীয় পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমেও প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ঈদের তিন দিন আগে থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সচেতনতামূলক তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়।
এছাড়া কোরবানির ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে সঠিকভাবে চামড়ায় লবণ প্রয়োগ। প্রতি গরুর চামড়ায় ৮ থেকে ১০ কেজি এবং প্রতি ছাগলের চামড়ায় ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ ব্যবহার। বায়ু চলাচলসমৃদ্ধ স্থানে চামড়া সংরক্ষণ। স্থানীয় পর্যায়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত চামড়া সংরক্ষণে উৎসাহ প্রদান। পশুর হাটে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ। অপপ্রচার ও চামড়া বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়ক ও মহাসড়কের পাশে পশুর হাট না বসানো এবং কোরবানির বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, কোরবানির চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের চামড়া শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করা সরকারের লক্ষ্য। জুলাই মাসের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, কোরবানির সব চামড়া একসাথে ঢাকায় আসে না, স্বাভাবিকভাবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। তবে এবার সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, বিসিক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।এবারের কোরবানির অধিকাংশ চামড়া ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, চামড়ার গুণগত মান উন্নয়নে জবাই ও স্কিনিং প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করা হবে। পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানোর কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে হয়। সঠিকভাবে স্কিনিং করা না হলে চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যায়। আমরা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আধুনিক ও মেকানাইজড করার পরিকল্পনা করছি।বর্তমানে দেশে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ও রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও চামড়াজাত পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








