ক্বীন ব্রিজে ফিরেছে ট্রাক, সার্কিট হাউসের ফোয়ারা বন্ধ
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫০ PM

সফর শেষে সিলেটে কী বদলাল?

ক্বীন ব্রিজে ফিরেছে ট্রাক, সার্কিট হাউসের ফোয়ারা বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭/০৯/২০২৬ ০৩:০৬:২০ PM

ক্বীন ব্রিজে ফিরেছে ট্রাক, সার্কিট হাউসের ফোয়ারা বন্ধ


রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট সফরকে ঘিরে কয়েক দিনের প্রস্তুতিতে বদলে গিয়েছিল নগরীর চেনা চিত্র। ক্বীন ব্রিজ এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল হকার ও সড়কে রাখা ট্রাক, পরিষ্কার করা হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সুরমা নদীর পাড়। প্রায় দুই দশক বন্ধ থাকার পর চালু হয়েছিল সার্কিট হাউসসংলগ্ন নান্দনিক ফোয়ারাও। তবে সফর শেষ হওয়ার এক দিনের মধ্যেই আবারও ক্বীন ব্রিজ-কালীঘাট সড়কের পাশে ট্রাক দাঁড় করানো শুরু হয়েছে, বন্ধ হয়ে গেছে সেই ফোয়ারা। ফলে রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে নেওয়া সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির সফর উপলক্ষে সিলেট নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ক্বীন ব্রিজ, সার্কিট হাউসসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়। 

সফরের আগে ক্বীন ব্রিজ এলাকা অনেকটাই ফাঁকা ও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল। সড়কের পাশে অবৈধ দখলও দেখা যায়নি। একইভাবে সার্কিট হাউসসংলগ্ন সুরমা নদীর পাড়ের ওয়াকওয়ে পরিষ্কার করে সাজানো হয়। দীর্ঘদিন অচল থাকা ফোয়ারাটিতেও ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে পানি প্রবাহিত হতে দেখা যায়।

কিন্তু রাষ্ট্রপতির সফর শেষ হওয়ার পর সেই পরিবর্তন ধরে রাখা যায়নি। ক্বীন ব্রিজ-কালীঘাট সড়কের পাশে আবারও পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখতে দেখা যাচ্ছে। এতে সড়কের জায়গা সংকুচিত হয়ে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। সার্কিট হাউসের সামনের এলাকাতেও ফিরে আসছে আগের ব্যস্ততা, হকার ও যানবাহনের জট।

ক্বীন ব্রিজ ও সুরমা নদীর পাড় সিলেট নগরের ঐতিহ্যবাহী ও আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। নগরবাসী ও পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও ট্রাক পার্কিং, অবৈধ পার্কিং ও বিভিন্ন ধরনের দখলের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটির সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কালীঘাট নগরের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার হওয়ায় প্রতিদিন সেখানে বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক আসে। কিন্তু ট্রাক রাখার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় সড়কের একাংশই অনেক সময় পার্কিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা তৈরি হয় এবং যানজটও বাড়ে। এর আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কালীঘাট এলাকায় দিনের বেলাতেও মালবাহী ট্রাক প্রবেশের কারণে যানজট বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছিল।

ক্বীন ব্রিজ এলাকার বাসিন্দা ফুয়াদ আহমেদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সফরের আগে কয়েক দিন ধরে দেখেছি রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা হচ্ছে, ট্রাক-হকার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তখন জায়গাটি দেখে মনে হচ্ছিল, এভাবেই হয়তো নগরটি সব সময় থাকবে। কিন্তু সফর শেষ হওয়ার পর আবার আগের চিত্র ফিরতে শুরু করেছে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী লোকমান আলী বলেন, ‘কালীঘাটে ব্যবসার প্রয়োজনে ট্রাক আসবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু রাস্তার ওপর ট্রাক রেখে দিলে পথচারী ও অন্য যানবাহন চলাচলে সমস্যা হয়। ট্রাক রাখার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা করা দরকার।’

রাষ্ট্রপতির সফরের আগে সুরমা নদীর পাড়ের পুরোনো ফোয়ারাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রায় দুই দশক অচল থাকার পর ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে এতে পানি প্রবাহিত হতে দেখা যায়। সার্কিট হাউসসংলগ্ন ওয়াকওয়ের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ফোয়ারাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০০৫ সালে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। প্রকল্পের আওতায় ওয়াকওয়ে, স্টিলের রেলিং ও নান্দনিক ফোয়ারা নির্মাণ করা হয়।

দীর্ঘদিন পর ফোয়ারাটি সচল হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তবে সফর শেষ হওয়ার পর সেটি আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ অতিথির আগমনকে কেন্দ্র করে যদি এটি চালু করা সম্ভব হয়, তাহলে নিয়মিত সচল রাখা হচ্ছে না কেন।

সিলেট নগরের বাসিন্দা শিক্ষার্থী দেব্রবত দাস বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর পর রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে ফোয়ারাটি চালু হতে দেখে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু সফর শেষ হওয়ার পর যদি আবার এটি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি হতাশাজনক। নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের কোনো স্থাপনা শুধু বিশেষ অতিথি এলে চালু হবে এটা হতে পারে না। ফোয়ারাটি নিয়মিত চালু রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা করা দরকার।’

আম্বরখানা এলাকার বাসিন্দা সাইফুল হক বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সফরের আগে সুরমা নদীর পাড় ও ওয়াকওয়ে যেভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছিল, তা দেখে নগরবাসী আশাবাদী হয়েছিল। কিন্তু সফর শেষ হওয়ার পর আবার আগের চিত্র ফিরলে সেই উদ্যোগের কোনো স্থায়ী সুফল থাকবে না। ফোয়ারাসহ পুরো এলাকার পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য নিয়মিত ধরে রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’

নগরবাসীর প্রশ্ন, বিশেষ কোনো অতিথির আগমনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের মধ্যে যদি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো পরিষ্কার, দখলমুক্ত ও শৃঙ্খলিত করা সম্ভব হয়, তাহলে সাধারণ সময়ে সেই পরিবেশ ধরে রাখা যাচ্ছে না কেন। তাদের অনেকের মতে, অতিথি এলে নগরকে পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত করার উদ্যোগ স্বাভাবিক হলেও সেই ব্যবস্থা অতিথির বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে সাময়িক প্রস্তুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ক্বীন ব্রিজ এলাকায় ট্রাক পার্কিংয়ের বিষয়টি নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম।

তিনি বলেন, ‘ক্বীন ব্রিজ এলাকায় গাড়ি রাখার বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ট্রাক চালকরাও অনেকদিন ধরেই এখানে গাড়ি রাখছেন। অন্যদিকে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণীয় জায়গার মধ্যে এমন ট্রাক পার্কিং দেখতে দৃষ্টিকটু লাগে। আমরা দ্রুতই এ বিষয়টি নিয়ে কমিশনার স্যারকে সাথে নিয়ে সকলের সাথে বসে বিষয়টা সমাধানের চেষ্টা করব।’

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে মিডিয়াতে কোন বক্তব্য দিতে পারব না। আপনি সিসিক প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বলুন।’

তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেট সফর করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর সফরকে ঘিরে নগরের বিভিন্ন সড়ক, ডিভাইডার, ক্বীন ব্রিজ ও সার্কিট হাউসসংলগ্ন এলাকায় যে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সফর শেষ হওয়ার পর তার অনেকটাই দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় নগরবাসীর প্রশ্ন রাষ্ট্রপতির সফরের জন্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যে পরিচ্ছন্ন ও শৃঙ্খলিত নগরী তৈরি করা সম্ভব, সাধারণ মানুষের জন্য সেই পরিবেশ সারা বছর ধরে রাখা সম্ভব নয় কেন?

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর