৫৩ বছরেও চিহ্নিত হয়নি '৭১ এর বধ্যভূমি
রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৮:০৮ PM

৫৩ বছরেও চিহ্নিত হয়নি '৭১ এর বধ্যভূমি

জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৬/০৩/২০২৪ ০১:২৪:১৭ AM

৫৩ বছরেও চিহ্নিত হয়নি '৭১ এর বধ্যভূমি


স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের বধ্যভূমি সংরক্ষণ বা চিহ্নিত করা হয় নি। সেই শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়নি কোন স্থাপনাও। গ্রামের মো. জব্বার কমান্ডারের পাশে ১০ জনকে পাক হায়েনারা গুলি করে হত্যার স্থানটি পড়ে আছে অযত্নে ও অবহেলায়। শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে এই স্থানটিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি করে আসছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসী।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে উপজেলা দক্ষিণ কামলাবাজ স্বাধীনতার পক্ষের গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। গ্রামে আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকহানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতেন। এই গ্রামের আব্দুল ওয়াহাব ও আব্দুল কাদির সরকার নামে দুই জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এজন্য গ্রামটির প্রতি আক্রোশ ছিল পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের। উত্তাল দিনগুলোর চার এপ্রিল সোমবার সকালে হঠাৎ গ্রামে হামলা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা।

অনেকে নদী সাঁতরে নদীর ওপারে চলে গেলেও রক্ষা পান নি গ্রামের ১০ জন মুক্তিকামী মানুষ। তাদেরকে আটক করে জব্বার কমান্ডারের বাড়ির পিছনে নদীর পাড়ে নিয়ে লাইন ধরিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে এজন নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে যান।

এই গ্রামবাসীর মধ্যে যারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন তারা হলেন, আব্দুল জব্বার কমান্ডার, কালু মুন্সি, সামছু মিয়া, আয়েত আলী, আব্দুল মিয়া, আব্দুর রহমান, কালা মিয়া, জজ মিয়া, মহরম আলী, কালু মিয়া। আহত হয়েছিলেন হারুন মিয়া ও করফুন নেছা।

দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের ৮০ বছর বয়সী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, হঠাৎ সকাল বেলা দেখি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে অত্যাচার ও যুবকদের আটক করছে। গ্রামের সবাই দৌঁড়ে পালিয়ে যায়, কেউ নদী সাঁতরে ওপারে চলে যায়। আমি সহ ১১ জনকে পাকবাহিনী ধরে ফেলে এবং আমাদেরকে মারধর করে। পরে আব্দুল জব্বার কমান্ডারের বাড়ির পিছনে নদীর পাড়ে সবাইকে জড়ো করে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি ছিলাম লাইনের সবার শেষে। বুদ্ধি করে আমি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে অনেক দূরে চলে যাই এবং নদীতে সাঁতরিয়ে পাশ্ববর্তী নয়াহালট গ্রামের আব্দুল বাতেন স্যারের ঘাটে গিয়ে উঠি। সেখানে গিয়ে দেখি আমার পড়নে লুঙ্গি নেই। বাতেন স্যার আমাকে একটা লুঙ্গি এনে দিলে, সেই লুঙ্গি পরে শ্বশুর বাড়ি পাশের গ্রাম চাঁনপুর চলে যাই। পরে জানতে পারি আমাদের গ্রামের কয়েকটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।   

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কলমদর বলেন, দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের ১০ জন শহীদের কথা কেউ মনে রাখেনি। এই দিনে তাঁদের স্মরণ করাতো দূরের কথা, গ্রামের গণহত্যার কথা কয়েকবার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ ও বিভিন্ন সময় সরকারি সভা-সমাবেশে প্রস্তাব করা হলেও তাদের নাম ঠাঁই পায়নি শহীদদের তালিকায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন বই প্রকাশ হলেও সেখানে দক্ষিণ কামলাবাজ বধ্যভূমির ঘটনা প্রকাশ পায় নি। এমনকি শহীদদের তালিকা ও তাঁদের স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণ করার ব্যাপারে কেউ উদ্যোগও নেয়নি। তিনি শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাদের তালিকা খোঁজে বের করে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করার দাবি জানান।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অ্যাডভোকেট আসাদ উল্লাহ সরকার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের সরকার ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী। অথচ জামালগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামে শহীদদের বধ্যভূমি স্মৃতি সংরক্ষণে কারও কোন ভূমিকা নেই। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামে একটি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হোক।

জামালড়ঘ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, আমাকে কেউ এই বিষয়ে অবগত করেনি। আমি বদলি হয়ে অন্যত্রও চলে যাচ্ছি। পরবর্তী ইউএনওকে বলে যাবো, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে একটি স্মৃতিস্তম্ভ যেন তৈরি করেন।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর