বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ন

বিসর্জনে বিদায় দুর্গতিনাশিনীর, সুরমার ঘাটে বিষাদ আর আগামীর প্রার্থনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১/১০/২০২৬ ০৫:৩১:১৬ অপরাহ্ন

বিসর্জনে বিদায় দুর্গতিনাশিনীর, সুরমার ঘাটে বিষাদ আর আগামীর প্রার্থনা

ছবি : মো. সোহেল মিয়া


ঢাকের বাদ্য, সিঁদুর খেলা আর চোখের জলে বিদায় বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সিলেটে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। পাঁচ দিন ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে পূজা-অর্চনা, আনন্দ-উৎসব আর ভক্তদের মিলনমেলার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে কৈলাসে ফিরে গেলেন দেবী দুর্গা। উৎসবের শেষ মুহূর্তে আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বিদায়ের বিষাদ। সেই বিষাদের মাঝেও ভক্তদের প্রার্থনা পৃথিবীর সব প্রাণী সুখে-শান্তিতে থাকুক, সবার জীবনে আসুক মঙ্গল।

সিলেট নগরের ঐতিহাসিক ক্বীন ব্রিজসংলগ্ন সুরমা নদীর ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে এসেছিলেন রাতুল বাগচী। দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘মা আজ কৈলাসে চলে যাবেন। অনেক বেশি কান্না পাচ্ছে। আমরা চাই, এই পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখে-শান্তিতে থাকুক। সবার মঙ্গল হোক।’

রাতুলের মতো অসংখ্য ভক্তের কাছে বিসর্জন শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আবেগ, ভালোবাসা আর প্রার্থনার মুহূর্ত। কয়েক দিনের উৎসব শেষে দেবীকে বিদায় জানানোর সময় অনেকের চোখেই ছিল জল। আবার আগামী বছর দেবীর আগমনের প্রত্যাশায় নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন ভক্তরা।

ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন থেকে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। পূজার শেষ দিনে মণ্ডপে মণ্ডপে চলে পূজা-অর্চনা, শুভেচ্ছা বিনিময় ও সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন, দেবীর চরণে জানান প্রণাম। আনন্দের এই আয়োজনের পর শুরু হয় বিদায়ের প্রস্তুতি। পরে শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় বিসর্জনস্থলে।

সিলেটের সুরমা নদীর ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। দেবীকে শেষবারের মতো প্রণাম জানিয়ে ভক্তরা কামনা করেন পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণ। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা নিয়ে দুর্গোৎসবের সূচনা, বিসর্জনের দিনেও সেই প্রত্যাশাই ফিরে আসে ভক্তদের প্রার্থনায়।

এবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজা। এর মধ্যে সিলেট জেলা পর্যায়ে সর্বজনীন ৪৪৮টি এবং পারিবারিক ২৬টিসহ মোট ৪৭৪টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে, সিলেট মহানগর এলাকায় সর্বজনীন ১৪৭টি ও পারিবারিক ১৬টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গোৎসব।

বিপুলসংখ্যক মণ্ডপে পূজার আয়োজনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকা ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ছিল উৎসবের আমেজ। পূজামণ্ডপে দেবীদর্শন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে উৎসব উদ্‌যাপন করেন ভক্তরা। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সেই উৎসবের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটলেও ভক্তদের মনে রয়ে যায় দেবীর আগমনের স্মৃতি।

দুর্গাপূজার শেষ দিনে তাই একদিকে যেমন ছিল উৎসব শেষ হওয়ার শূন্যতা, অন্যদিকে তেমনি ছিল আগামী দিনের জন্য শুভকামনা। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গার আগমন অশুভের বিনাশ ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে আসে। বিসর্জনের পরও সেই বার্তা ধারণ করে তাঁরা প্রত্যাশা করেন, পৃথিবী থেকে দূর হবে অশান্তি, প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও সম্প্রীতি।

সুরমার জলে প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। তবে রাতুল বাগচীর কণ্ঠে উচ্চারিত প্রার্থনার মতো অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা সব প্রাণী ভালো থাকুক, মানুষের জীবনে আসুক সুখ ও শান্তি, আর সবার মঙ্গল হোক। সেই আশাতেই আগামী বছরের দুর্গোৎসবের অপেক্ষা শুরু হলো সিলেটের ভক্তদের।

আজকের সিলেট/এপি

সিলেটজুড়ে


মহানগর