অব্যাহত বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে আবারো সিলেট অঞ্চলে বন্যঅর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিলেটে গত ২৪ ঘন্টায় ২৪৯ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে আগামী দুই দিন বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। সিলেটের ওপর দিয়ে বয়ে চলা নদ-নদীর পানি ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। গত দুইদিনের বৃষ্টিপাতে সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায় বাঁধ ভেঙে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আর ভারতের মেঘালয় পর্বতের চেরাপুঞ্জি এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে সিলেট বিভাগের জেলাগুলোর জন্য বন্যা আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমাদের জৈন্তাপুর প্রতিনিধি জানান, দুইদিনের বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
মঙ্গলবার উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাওযার খবর পাওয়া গেছে।
এছাড়া বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত বড় নদী সারী, বড়গাং, নয়াগাং ও রাংপানি নদীর বিপৎ সীমার কাছাকাছি রয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে গত দুইদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন মানুষজন। বিশেষ করে গবাদি পশু নিয়ে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন ভুক্তভোগীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের গোয়াবাড়ী, বাইরাখেল, মযনাহাটি, বন্দরহাটি, মেঘলী, তিলকৈপাড়া, ডিবিরহাওর, ফুলবাড়ী, টিপরাখরা, খলারবন্দ, মাঝেরবিল, হর্নি, নয়াবাড়ী, কালিঞ্জিাদবাড়ী, জৈন্তাপুর ইউনিয়নের লামনীগ্রাম, মোয়াখাই, বিরাইমারা, মুক্তাপুর, বিরাইমারা হাওর, লক্ষীপুর, কেন্দ্রী, খারুবিল, নলজুরী, শেওলারটুক, বাওনহাওর, চারিকাটা ইউনিয়নের লাল, থুবাং, উত্তর বাউরভাগসহ বিভিন্ন গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।
ডিবিরহাওর গ্রামের বাসিন্দা হারুন মিয়া, মানিক মিয়া, মাসুক আহমদসহ অনেকেই বলেন, পাহাড়ি ঢলে এবং অতিবৃষ্টির কারনে এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। যার কারনে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এই বন্যার পানি বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। বৃষ্টি থামলে পানি নেমে যাবে। তবে সৃষ্ট বন্যায় কৃষকদের কোন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
হনি, বাইরাখেল, মাঝের গ্রামের বাসিন্ধা গনি মিয়া, আব্দুস শুকুর, হোসেন আহমদ বলেন, অতিবৃষ্টির কারনে এবং উজান হতে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। যদি বৃষ্টি না থামে তাহলে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। তবে বৃষ্টি থেমে গেলে ৪-৫ ঘন্টার মধ্যে পানি নেমে যাবে।
জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালিক রুমাইয়া জানান, টানাবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে ফ্লাস বন্যায় উপজেলার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের খোঁজ খবর রাখা হচ্ছে। বন্যা মোকাবেলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া সকল নদী পথে যাতায়াতকারীদের সর্তকবস্থায় চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমাদের গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গোয়াইনঘাটের প্রায় সবকটি ইউনিয়নে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ কারণে বাড়তে শুরু করেছে উপজেলার নদ-নদীর পানি। পিয়াইন, সারী গোয়াইন নদীর পানিও বাড়তে শুরু করেছে। ঢলের পানিতে প্লাবিত এলাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হঠাৎ করে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে জাফলং জিরো পয়েন্ট ও মায়াবী ঝর্ণায় কয়েক লক্ষ টাকার মালামালসহ ভেসে গেছে অর্ধ্ব শতাধিক খুপরি দোকান। এছাড়া তেমন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায় নি।
বিছনাকান্দি ইউনিয়নের দমদমা গ্রামের লিলু মিয়া জানান,গত কয়েক দিন ধরে তীব্র তাপদাহ ( গরমে) অতিষ্ঠ ছিল জনজীবন।আকস্মিক এই দুই দিনের মুষলধারে বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি বাড়ির চারপাশে বন্যার পানি।এভাবে পানি বাড়তে থাকলে কিছু সময়ের মধ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাবে।
ফতেপুর ইউনিয়নের চা শ্রমিক সন্তান যতিন শিং ছত্রী জানান, টানা বৃষ্টিতে গত রাতে গুলনী চা বাগানের চা শ্রমিক কাজল ভৌমিক এর নতুন ঘর ধসে সম্পুর্ন ঘরটি মাটিতে পড়ে যায়। বাড়িতে কেউ না থাকায় আসবাবপত্র ছাড়া আর কোনো ক্ষতি হয়নি।
জাফলং টুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর রতন শেখ জানান,ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আস পাহাড়ি ঢলে পিয়াইন নদী টুই -টুম্ভুরে পরিণত হয়েছে।
জাফলংয় পর্যটন কেন্দ্র ও মায়াবী ঝর্ণায়ব্যবসায়ীদের মালামালসহ অগণিত দোকানঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়া জনিত কারণে নদ নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.তৌহিদুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে গোয়াইনঘাট উপজেলার কোথাও তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে গোয়াইনঘাট উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী গোয়াইনঘাট নদীতে বিপদসীমার ১.৬ নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বিপদসীমা ১০.৮২ মিটার, প্রবাহমান ৯.১৩ মিটার। জরুরি ভিওিতে গোয়াইনঘাটে ৫০মেট্রিক টন জি.আর খাদ্যশস্য (চাল)৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দের জন্য সিলেট জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দিয়ে অনুরোধ করা হয়েছে।
আমাদের কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, কুলাউড়ায় দুইদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গোগালিছড়া নদীর বাঁধ ভেঙে প্রায় ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে এসব এলাকার শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে সোমবার সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়ে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তা চলে। এতে পাহাড়ি ঢলে মঙ্গলবার সকালে গোগালিছড়া নদীর বাঁধের জয়চণ্ডীর গাজীপুর দাখিল মাদ্রাসার কাছে ১টি ও কুলাউড়া সদর ইউনিয়ন এলাকায় আরও ১টি ভাঙন দেখা দেয়। এতে ভাঙনকবলিত স্থান দিয়ে পানি ঢুকে জয়চণ্ডী ও সদর ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে যায়।
খবর পেয়ে দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মো. মহিউদ্দিন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শিমুল আলী, জয়চণ্ডী ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুর রব মাহবুব, সদর ইউপির চেয়ারম্যান মোছাদ্দিক আহমদ নোমান প্রমুখ।
উপজেলার গাজীপুর এলাকার বাসিন্দা আকাশ আহমদ জানান, ভাঙনকবলিত স্থান দিয়ে প্রবলবেগে পানি ঢুকছে। বাড়িঘরে পানি উঠে যাওয়ায় লোকজন ঘরের নিচে থাকা মালপত্র খাটের উপরে তুলে রেখেছেন।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মো. মহিউদ্দিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, বন্যাদুর্গত মানুষের তালিকা করে দ্রুত ত্রাণ দেওয়া হবে।
এদিকে, ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে মেঘালয় রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে গত ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টি হয়েছে। গত দুইদিনে মেঘালয় পর্বতের চেরাপুঞ্জি এলাকায় ১ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের আশংকা করা হচ্ছে। যার কারণে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক ও সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নদীগুলোতে পাহাড়ি ঢল নেমে আসার প্রবল আশংকা করা যাচ্ছে।
জানা গেছে, মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পর্বত এলাকার সোহরা নামক স্থানে সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯ টা পর্যন্ত ৫৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মেঘালয় রাজ্যের অন্যান্য স্থানে ২০০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯ টার পর থেকে আগামীকাল বুধবার সকাল ৯ টার মধ্যে আরও ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মেঘালয় রাজ্যের এই বৃষ্টিপাতের পুরোটাই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন নদ-নদীগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হয়। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য যদি সঠিক হয় তবে সিলেট বিভাগের নদ-নদী গুলিতে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে সিলেটের বিভিন্ন নদীগুলোর পানি বেড়ে এই অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি









