প্রাকৃতিক হাওল-বিল-জলাভূমি এগুলো বাংলাদেশের প্রাণ। নদী দূষণের কারণে ‘নদীমাতৃক’ শব্দটি কিছুটা ভাটা পড়ে এলেও প্রাকৃতিক হাওরবিল ততটা নিঃশেষ হয়ে যায়নি বাংলার বুক থেকে। বস্তুত পক্ষে এগুলোই দেশের প্রাণ।
জলাভূমির অন্তঃপুর থেকে আপনাআপনি গজিয়ে উঠা তৃণ জলচর পাখিদের জোগান দেয় খাদ্যনির্ভরতার বার্তা। ভাসমান ফেনার আড়ালে দেহমুখ লুকিয়ে তারা কাটিয়ে দেয় একেকটি দিন আর রাত।
আবাসিক পাখিদের বাৎসরিক নিমন্ত্রণে যোগ দিতে প্রতি বছর হাজার হাজার কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে এই বাইক্কা বিলে আসে পরিযায়ী পাখিদের দল। নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখিরা বিভিন্ন প্রজাতির অবাসিক পাখিদের সাথে মিলে এখানেই রচনা করে পাখিস্বর্গ। এ যেন সত্যিকারের এক বিস্ময়!
তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। অপরাহ্নে রোদের তীব্রতার ভেতর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সিলেট বিভাগের মাঝে উল্লেখ্যযোগ্য সমৃদ্ধ একটি জলাধার ‘বাইক্কা বিল’। অপরাহ্নের এরূপ রৌদ্রময় উত্তাপে সবকিছুই যেন নতুন সৌন্দর্যের মোড়কে মেলে ধরা। এটি মৌলভীবাজার জেলার একমাত্র মৎস্য অভয়ারণ্য। অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই বিলটিতে রয়েছে প্রাকৃতিক জলাভূমির বিস্ময়কর উপকারিতা। যা দিনের পর দিন মৎস্য সম্পদকে সমৃদ্ধ করে চলেছে নীরবে।
বাইক্কা বিলে রয়েছে জলচর পাখির কিচিরমিচির শব্দ, ঝাঁক বেঁধে ওড়ে বেড়ানো পরিযায়ী পাখিদের ঝাক, বিলের পানিতে জলচর পাখিতে ঝাঁপাঝাঁপি- এ যেন চির সৌন্দর্যের অদেখা একেকটি রূপ। ইতোমধ্যে এই বাইক্কা বিলে আসতে শুরু করেছে পরিযায়ী পাখি।
হাইল হাওরের পূর্ব দিকের প্রায় ১শ হেক্টর আয়তনের একটি সমৃদ্ধ জলাভূমি বাইক্কা বিল। পূর্বপাশেই রয়েছে প্রায় ২৫০ একর আয়তনের জলাভূমি নিয়ে অপরূপ সৌন্দর্যের এই বাইক্কা বিলে শীত মৌসুমে প্রায় ১৭৫ প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে।
বিলের মূল আকর্ষণ পরিযায়ী আর স্থানীয় পাখি হলেও এই বিল-কে মাছের রাজ্যও বলা হয়। ঋতুভেদে বাইক্কা বিল ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। বিলের বুনো বাসিন্দা, পাখিদের গতিবিধি আর বিলের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সেখানে তৈরি হয়েছে একটি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।
শঙ্খচিল, ভূবনচিল, দলপিপি, নেউপিপি, পাতি সরালি হাঁস, বালি হাঁস, মরচেরং ভূতি হাঁস, পানকৌড়ি, গো-বক, ধলাবক, বেগুনি কালেম প্রভৃতি পাখিদের কলকাকলিতে মুখর বাইক্কা বিলের জলজ জীববৈচিত্র।
চাপড়া, মাগুড়া ও যাদুরিয়া বিলের নামে ২০০৩ সালে বাইক্কাবিল স্থায়ী মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়। অভয়াশ্রমটির জীববৈচিত্র্য ফিরে পাওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শুরু থেকে সরকার বড়গাংগিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে। ধীরে ধীরে এ বিলে বিপন্ন বা হারিয়ে যাওয়া মাছেদের প্রজনন রক্ষার ব্যাপারটি ঘটে গেছে। এর পাশাপাশি আবাসিক ও পরিযায়ী পাখিদের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বাইক্কা বিল আজ সুপরিচিত।
মৌলভীবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, বাইক্কা বিল স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম। মৎস্য অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ২০০৩ সাল থেকে এটি চালু আছে। আসলে আপনারা অনেকেই জানে বাইক্কা বিল হাইল হাওরের একটি বিল এবং পুরো বিলটি স্থায়ী অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। এখানে অতোপ্রতভাবে জড়িত আছে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, বন বিভাগ সবাই মিলে আসলে আমরা এখানে কাজ করছি। কারো একার পক্ষে এতো বড় একটি বিল এতো বড় একটি জলাভূমি সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগণ সম্পৃক্ত আছে। সাংবাদিক ভাইয়েরা সম্পৃক্ত আছে এবং স্থানীয় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি, জেলে সবাই মিলে আমরা এই বিলটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, যেহেতু পুরো বিলটি লিজ হয় না কখনোই, যার ফলে এখানে মাছের পাশাপাশি সমস্ত রেপটাইলস (সরীসৃপ প্রাণী), স্তন্যপায়ী প্রাণী, উভচর প্রাণী, সব প্রাণীরই একটি সুন্দর ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে এবং এখানের ইকোসিস্টেমর হেল্থটা (খাদ্যশৃঙ্খলের স্বাস্থ্য) বাংলাদেশের যে কোনো জলাভূমির চেয়ে অনেক অনেক বেটার (অধিকতর ভালো)। এই কারণেই এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে একটি দর্শনীয় জায়গা হিসেবে পরিণত হয়েছে। তবে একসময় পর্যটকরা এখানে আসতো, কিন্তু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা মহোদয়ের একটি ঘোষণা অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি থেকে কোনো দর্শককেই আমরা প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি না।
পরবর্তীতের সরকার যে রূপ সিদ্ধান্ত নেবে বাইক্কা বিলের বিষয়ে আমরা স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবো বলে জানান এই সরকারি কর্মকর্তা।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 








