কুলাউড়ায় মনু নদীতে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন
রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৪:০২ PM

কুলাউড়ায় মনু নদীতে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭/০১/২০২৬ ১০:৫৮:৪৪ AM

কুলাউড়ায় মনু নদীতে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন


মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে মনু নদীর তলদেশ খনন করে বালু উত্তোলন করার কারণে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বালুমহালের ইজারাদার গং কর্তৃক মনু নদীর কটারকোনা সেতুর পাশ থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন ও ট্রলার দিয়ে বালু উত্তোলন করায় সৃষ্ট গর্তে ডুবে নাঈম হোসেন (১৭) নামে এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে কটারকোনা সেতু এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার পর নদী তীরবর্তী এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

খবর পেয়ে শনিবার দিনব্যাপী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুল ইসলামের নেতৃত্বে কটারকোনা সেতু এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কুলাউড়া থানার পুলিশ সহযোগিতা করে। অভিযানকালে বালুমহালের ইজারাদারের ৫টি ড্রেজার মেশিন ও ২টি ট্রলারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি জব্দ করে স্থানীয় হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমদ চৌধুরী বুলবুলের জিম্মায় রাখা হয়। এর আগে প্রশাসনের কয়েক দফার অভিযানে বালুমহালের বর্তমান ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপিকে প্রায় ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন।

স্থানীয় লোকজন জানান, গত এক সপ্তাহ আগে কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর নোয়াগাঁও তালিমুল কোরআন মাদরাসার ১৪ জন শিক্ষার্থী কুলাউড়া উপজেলার মনু কটারকোনা কওমী মাদরাসায় বেফাক বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে এসেছিল। শুক্রবার সকালে তিন বন্ধুর সাথে কটারকোনা সেতু এলাকায় মনু নদীতে গোসল করতে গিয়ে বিশাল গর্তে ডুবে নিখোঁজ হয় নাঈমসহ তার সহযোগীরা। পরে মাদরাসায় খবর দেওয়া হলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় এলাকার লোকজন প্রায় দুই ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তিন ছাত্রকে জীবিত উদ্ধার করলেও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নাঈমকে। মৃত নাঈম কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের উত্তর কানাইদেশী এলাকার হোসেন আলির ছেলে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মনু নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন বর্তমান ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপি ও তার সহযোগী দীপক দে। ফলে হাজীপুর ও টিলাগাঁও ইউনিয়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্রাহ্মণবাজার-শমসেরনগর সড়কে মনু নদীর ওপর নির্মিত কটারকোনা সেতু চরম হুমকির মুখে রয়েছে। সেতুর পাশের পিলারের চারপাশের বালু ও মাটি সরে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে সেতু রক্ষায় ভুক্তভোগী এলাকার লোকজন মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা করে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপিও দেন। 

তারা বলেন, স্থানীয় একটি মহলের সহযোগিতায় ইজারাদারের লোকজন অবাধে নদীর তলদেশ ৪০-৫০ ফুট খনন করে বালু উত্তোলন করে রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছে। এতে নদীর বুকে তৈরি হয়েছে মৃত্যুকূপের মতো বড় বড় গভীর গর্ত। প্রতিবছরই এখানে ঘটে দুর্ঘটনা। অথচ প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। ২০২২ সালে বনভোজনে এসে এক শিক্ষার্থী কটারকোনা সেতু এলাকার পাশে গর্তে ডুবে মারা যায়। ২০২৩ সালে এক পথচারী, ২০১০ সালে কটারকোনা এলাকার বাসিন্দা আনুছ মিয়ার ছেলে লাদিন হোসেন (৮), ২০১১ সালে একই গ্রামের মৃত আছন আলীর ছেলে মারজান আহমদ (১২) মনু নদীর তলদেশে গভীর গর্তে পানিতে ডুবে মারা যায়। 

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, মনু নদীর বালুমহাল চলতি সনে ইজারা নেন হবিগঞ্জের যুবলীগ নেতা সেলিম আহমদের স্ত্রী নাজমুন নাহার লিপি। অথচ মনু নদীর বালুমহাল ইজারার নীতিমালায় উল্লেখ ছিল- নদীর উপর নির্মিত সেতুর উভয় পাশে প্রায় ১ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বালু উত্তোলন করা যাবে না। কিন্তু ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপি ও সহযোগী দীপক দে সেই শর্ত ভঙ্গ করে একের পর এক ড্রেজার মেশিন দিয়ে কটারকোনা সেতুর পাশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। যার কারণে কটারকোনা সেতু চরম হুমকির মুখে রয়েছে। 

অভিযোগের বিষয়ে বালুমহালের বর্তমান ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপির ব্যবসায়িক সহযোগী দীপক দে বলেন, মনু নদী থেকে বালু উত্তোলন করায় সৃষ্ট গর্তে ডুবে নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এখন থেকে সরকারি নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করা হবে। 

হাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি অবৈধ বালু উত্তোলনের সরাসরি ফল। বহুবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ইজারাদার গং প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নদীর তলদেশ ৪০-৫০ ফুট গভীর করে খনন করে বালু উত্তোলন করছে। দীর্ঘদিন থেকে কটারকোনা সেতু এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর পাড়ের মানুষের জীবন এখন হুমকির মুখে রয়েছে। 

সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুল ইসলাম বলেন, ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালিয়ে ইজারাদারের ৫টি ড্রেজার মেশিন, ২টি ট্রলারসহ সরঞ্জামাদি জব্দ করে হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিম্মায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বালু উত্তোলনের স্থাপনাগুলো নির্ধারিত স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ইজারা চুক্তি ভঙ্গ করে বালু উত্তোলনের অপরাধে ইজারাদারকে এর আগেও কয়েক দফায় মোট ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে সতর্ক করা হয়েছিল। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারকে অবহিত করা হয়েছে। নিয়ম না মেনে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকিতে থাকা কটারকোনা সেতু ও নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষায় এবং স্থানীয় লোকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মনু নদীর বালুমহালের ইজারা বাতিলের জন্য একটি প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। তখন একটি স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে। 

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, মনু নদীতে গর্তে ডুবে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা জেনেছি। সাথে সাথে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছি বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য। এরই প্রেক্ষিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, কটারকোনা সেতু রক্ষা ও স্থানীয় লোকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থায়ী একটি সমাধানের উদ্যোগ অচিরেই নেওয়া হবে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর