সমস্যায় জর্জড়িত শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১২:৩৯ AM

সমস্যায় জর্জড়িত শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০/০৪/২০২৬ ১১:২৭:৩৭ AM

সমস্যায় জর্জড়িত শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স


মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত কম থাকায় দায়িত্বরত চিকিৎসকদের রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে পুরো হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স, একজন চালক এবং একজন নৈশপ্রহরী দিয়ে। অথচ এখানে অন্তত দুটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুজন চালক থাকার কথা।

জানা গেছে, ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা উন্নত করার লক্ষ্যে সরকারের এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। শয্যা সংখ্যা ৫০ হলেও জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালটির কার্যক্রম এখনো ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট দীর্ঘদিন ধরে প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি কনসালটেন্ট পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদের মধ্যে রয়েছে— জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (চর্ম ও যৌন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি), জুনিয়র কনসালটেন্ট (কার্ডিওলজি), জুনিয়র কনসালটেন্ট (নাক-কান-গলা) এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট (চক্ষু)।

এ ছাড়া মেডিকেল অফিসারের ৫টি, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ১টি, সহকারী সার্জনের ৪টি, সিনিয়র স্টাফ নার্সের ৭টি এবং ফার্মাসিস্টের ১টি পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (এসআই) ১টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) ১টি, পরিসংখ্যানবিদ ১টি, কার্ডিওগ্রাফার ১টি, কম্পিউটার অপারেটর ১টি এবং অফিস সহকারী কাম ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ১টি পদও খালি রয়েছে।

অন্যান্য শূন্য পদের মধ্যে রয়েছে— স্বাস্থ্য সহকারী ৪টি, হেলথ এডুকেটর ১টি, অফিস সহায়ক ২টি, ওয়ার্ড বয় ২টি, আয়া ১টি, বাবুর্চি ১টি এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ৩টি পদ।

দীর্ঘদিন ধরে এসব পদ শূন্য থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামও কার্যকর রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে গত প্রায় ১৮ বছর ধরে এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন এবং ইসিজি মেশিন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।

অন্যদিকে, চিকিৎসক সংকটের কারণে উপজেলার চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের দিয়ে জরুরি বিভাগের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। এতে করে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে বিশ্বস্ত এক সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ঘাটতির তালিকায় রয়েছে— বিপি মেশিন ৫০টি, স্টেথোস্কোপ ৫০টি, ডিজিটাল ওজন মাপার মেশিন ১০টি, নেবুলাইজার ২০টি, পালস অক্সিমিটার ২০টি, ইসিজি মেশিন ১০টি, অ্যালিস টিস্যু ফোর্সেপ (১.৩ টিথ) ১০টি, ইনস্ট্রুমেন্ট বক্স ১০টি, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর ১০টি এবং স্টেরিলাইজার ও অটোক্লেভ ৫টি করে। এছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও সীমিত পরিসরে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো রোগী ও সেবাবান্ধব নয়; এমনকি প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী— যেমন আয়া, ওয়ার্ড বয়, স্ট্রেচার বয়, ওটি বয়, টিকিট ক্লার্ক ও বাবুর্চি— বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীও নেই।

ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ-পরবর্তী বাধ্যতামূলক ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না। মাঠপর্যায়ে আধুনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদান ও প্রচার-প্রচারণার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ইপিআই টিকা পরিবহনের জন্য স্থায়ী পোর্টার (কর্মচারী) না থাকাও একটি বড় ঘাটতি।

উপজেলা হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ বাজেট অপর্যাপ্ত, এবং বাজেট বণ্টনেও নানা জটিলতা রয়েছে। যেমন— এমএসআর বিভাজন, অফিস পরিচালনার বিভিন্ন অর্থনৈতিক কোডে বরাদ্দের অভাব, এমনকি কিছু কোড আইবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকা। উপজেলা স্বাস্থ্য প্রধান হিসেবে পদায়নের আগে অফিস ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বা ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবও লক্ষণীয়।

হাসপাতালের জরুরি অবকাঠামো মেরামতে জটিলতা রয়েছে। নিজস্ব অর্থায়ন বা এখতিয়ার না থাকায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে কাজ করাতে গিয়ে সময়মতো ও সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। উপজেলা পর্যায়ে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ বাড়ছে। তাছাড়া ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকায় সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, জনবল সংকটের মধ্যেও আমরা রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর অভাব, যার কারণে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হতো।

মৌলভীবাজার জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, ধাপে ধাপে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর