সিলেটের সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যার তিন মাস পার হলেও এ পর্যন্ত ধরা পড়েনি জড়িত কেউ। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পিবিআই পেলেও এ পর্যন্ত তারা আনুষ্ঠানিক কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি নিহতের পরিবারকে। আর এমনি পরিস্থিতিতিতে চরম হতাশায় নিহত তুরাবের পরিবার। নগর ছেড়ে গ্রামেই ফিরে যাচ্ছেন তুরাবের মা মমতাজ বেগম। এমনটি জানা গেছে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে।
১৯ জুলাই বাদ জুম্মা সিলেট নগরের কোর্টপয়েন্টে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলের ছবি তোলার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি এবং জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার এটিএম তুরাব। তুরাব সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার পৌরশহরের ফতেহপুর গ্রামের মাস্টার আব্দুর রহিমের কনিষ্ট পুত্র। তিনভাই এক বোনের মধ্যে তুরাব ছিলেন সবার ছোট। সিলেট নগরের যতরপুরে মা আর ভাইদের সঙ্গে তিনি বাস করতেন। মাত্র আড়াই মাস আগে বিয়ে করেছিলেন তিনি। মেহেদীর রঙ মোছার আগেই বিধবা হয়ে যান তাঁর যুক্তরাজ্য প্রবাসী সহধর্মিনী। সাংবাদিকতা জীবনের প্রায় ১৫ বছরে জাতীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার, ব্রাক মাইগ্রেশন অ্যাওয়ার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন ছিলো তাঁর। সিলেট প্রেসক্লাব, বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এটিএম তুরাব। গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার সংবাদ, সপ্তাহজুড়ে’সহ একাধিক গণমাধ্যমে তিনি কাজ করেছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে গত ১৯ জুলাই দুপুরে নগরের বন্দরবাজার এলাকা থেকে মিছিল বের করে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠন। সেখানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বেঁধে যায় মিছিলকারীদের। পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছোঁড়ে। ওইদিন আরও কয়েকজন সহকর্মীর সাথে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তুরাব। আর সেখানেই গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। সংঘর্ষ শুরুর কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত সহকর্মীরা দেখেন তুরাব মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। তৎক্ষণাৎ তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান সহকর্মীরা। পরে সেখান থেকে তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থান তুরাব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন ২০ জুলাই ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তুরাবের মরদেহের ময়না তদন্ত হয়। সেদিন বিকেলে গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
ঘটনার পর দিন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান শামসুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান ‘নিহতের শরীরে ৯৮টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায় ঢিলের আঘাতও ছিল। এ কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে, এ ঘটনার পর সিলেটের সাংবাদিক সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সিলেট প্রেসক্লাব, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবসহ সিলেটের সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বশীল ৭টি সংগঠন যৌথভাবে প্রতিবাদ করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রæত গ্রেপ্তার এবং শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানায়। এরপর বিভিন্ন সময়ে পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকরা।
ঘটনার পরপরই কোতায়ালি থানা পুলিশ বাদী হয়ে ৩৪ জনকে আসামি করে কোতায়ালি থানায় একটি মামলা করেন। এতে পুলিশের কাউকে আসামির তালিকায় রাখা হয়নি। বেশিরভাগ বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়। এতে সন্তুষ্ট হননি নিহতের পরিবার। ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিলেটের সাংবাদিকরাও। ফলে ঘটনার এক মাস পর ১৯ আগস্ট নিহতের ভাই আবুল হাসান মো. আযরফ (জাবুর) বাদী হয়ে সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালছাড়াও এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো. সাদেক দস্তগির কাউসার, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। সেই সঙ্গে অজ্ঞাতনামাও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভোররাতে মামলার ৬নং আসামি- ঘটনার সময়কার সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মঈন উদ্দিন শিপনকে তার বাড়ি থেকে বিজিবি আটক করে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ অবস্থায় মামলাটির তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন আদালত। ফলে ৮ অক্টোবর কোতায়ালি থানা পুলিশ মামলার নথিপত্র পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করে। পরদিন ৯ অক্টোবর মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মোহম্মদ মুরসালিনের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেখানে সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত থেকে তাদেরকে সহযোগিতা করেন। কিন্তু এরপর আর এ মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই জানা যাচ্ছে না। ফলে এক ধরনের চরম হতাশায় পড়েছেন সাংবাদিক এটিএম তুরাবের মা ও ভাইয়েরা।
সাংবাদিক এটিএম তুরাবের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এ মাসেই গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে এটিএম তুরাবের মা মমতাজ বেগম বলেন, ছেলের জন্যই তিনি শহরে আসেন। আগে তুরাব তার বোনের উপশহরের বাসায় থেকে সাংবাদিকতা করতেন। তার বোন আমেরিকা চলে যাওয়ায় তিনি একা হয়ে যান। ফলে তার জন্যই তারা সবাই শহরে চলে আসেন। পাশাপাশি তার চিকিৎসাও চলতো। এখন ছেলে নেই। তাই তিনি এ শহরে থাকতে চান না।
সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যা মামলার বাদী ও তার বড় ভাই আবুল হাসান মোহাম্মদ আযরফ(জাবুর) বলেন, আমরা খুবই হতাশ। একটি ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটলো। মামলার এতদিন পরও কোনো অগ্রগতি নেই। খুনিরা এখনও বহাল তবিয়তে। কোনো আসামি ধরা পড়ছে না। তাদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তও নেয়নি প্রশাসন। ফলে আমি আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার পাবো কী না তা নিয়ে সংশয়ে আছি।
পিবিআইর পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মুরছালিন বলেন, মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত কাজ চলছে। শীগ্রই অগ্রগতি জানতে পারবেন।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








