সুনামগঞ্জের আবুয়া নদীর ওপর নির্মিত ফতেহপুর পিসি গার্ডার সেতু উদ্বোধনের আগেই গোড়ার মাটি নদীতে ধসে যাচ্ছে। সেতুর গোড়ায় ড্রেজিংয়ের বালু-মাটি ডাম্পিং করার কারণে এ ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি হুমকির মধ্যে পড়েছে।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে ২২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বিশ্বম্ভরপুরের নিয়ামতপুর-তাহিরপুর সড়কের আবুয়া নদীর ওপর ফতেহপুর গ্রামের কাছে ৪৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থের সেতু নির্মাণ করে। ২০১৮ সালে শুরু হয়ে সেতুর কাজ শেষ হয় ২০২২ সালে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ১০০ সেতুর সঙ্গে এই সেতুটিও উদ্বোধন করেন।কিন্তু অ্যাপ্রোচ সড়ক না থাকায় সেতুটি কাজে আসছিল না। এর আগে ১৫ বছর আগে এখানেই নির্মীয়মাণ সেতুটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়।
সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের বিশ্বম্ভরপুর অংশের নিয়ামতপুর থেকে উত্তরে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ারপুর গেছে সড়কটি। যৌথভাবে সংস্কার ও নির্মাণকাজটি পেয়েছে সালেহ অ্যান্ড ব্রাদার্স ও কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। তবে কাজটি সাবকন্ট্রাক্ট নিয়ে কাজ করছেন আব্দুল হান্নান নামের একজন ঠিকাদার। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজনকে দিয়ে সড়কের মাটি ও সেতুর সংযোগে মাটি ভরাটের চুক্তিও করেছেন। তারাই এখন মাটি ভরাট করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মাটি সরবরাহকারীরা বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি এনে আবুয়া সেতুর গোড়ায় ড্রেজার মেশিন লাগিয়ে সেই মাটি উত্তোলন করছে। মাটির সঙ্গে পানি আসায় এই পানি অপসারণের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সেতুর গোড়া হয়ে চুইয়ে পড়ছে পানি। ফলে সেতুর গোড়ায় বিরাট ধস দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন যুবক প্রতিবাদ করায় তাদের ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে ঠিকাদারের লোকেরা।
এদিকে সেতুর গোড়ায় ধসের খবর পেয়ে রোববার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি ও সড়ক বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সহদেব সূত্রধর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তখন স্থানীয়রা তাঁদের জানায়, ড্রেজার মেশিনে মাটি উত্তোলন করার কারণে সেতু গোড়ায় ধস দেখা দিয়েছে। তখন তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারের লোকদের এভাবে মাটি ভরাটে নিষেধ করে সেতুর ধস এলাকা আবারও মাটি ভরাট করে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা টিটু রঞ্জন দাস ও রাধানগর গ্রামের রনি রক বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে এ ব্রিজের মাধ্যমে। কিন্তু সেতুর সব কাজ শেষ না হওয়া ও উদ্বোধনের আগেই এর পাশে অপরিকল্পিকভাবে ড্রেজিংয়ের বালু-মাটি রাখার কারণে ওই মাটির চাপে গোড়ায় ফাটল দেখা দিয়েছে এবং নদীতে ধসে পড়ছে।
অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবঠিকাদার রণজিৎ চৌধুরী রাজনের দাবি, গোড়ায় মাটির রাখার কারণে সেতুর কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কিছু দুষ্কৃতকারী রাতে মাটির ডাম্পিংয়ের বাঁধ কেটে দেওয়ায় নদীর পাড়সহ সেতুটি হুমকির মুখে পড়েছে। তাই এর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মফিজুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ফতেপুর সেতু এলাকা পরিদর্শন করেছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন জানিয়েছে, সরকারি উন্নয়নকাজের জন্য দূর থেকে নৌকা দিয়ে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মাটি আনা হচ্ছে। সেই মাটি সেতুর পাশে রেখে সড়কে তোলার সময় সেতুর কাছে একটি অংশ ধসেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি মাটি রক্ষার পলিথিলিন কেটে দেওয়ায় নাকি এ অবস্থা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সওজ কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে কাজ মনিটরিং ও সেতু এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য বলেছি।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি ভরাটের জন্য ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সেতুর গোড়া থেকে পাম্পিং করে ওপরে উঠানো হচ্ছিল। পাম্পিংয়ের পানির কারণে সেতুর তলদেশের কিছু মাটি ধসে গেছে। তাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখানে মাটি ডাম্পিং বন্ধ করতে বলেছি এবং যেটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে বাঁশ, বল্লি দিয়ে মাটি ভরাটসহ দ্রুত মেরামত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








