সিলেটে আদালতে নেই পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা। যে কারণে আদালতে সেবা নিতে আসা এসব মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমশ সংশয় বাড়ছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হল আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ। আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে বিচার বিভাগের ভূমিকা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের সরকারী-বেসরকারী সকল নাগরিক বিচারের দ্বারস্থ হতে ছুটে যান আদালতে। যার ফলে বিচারকার্যকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই কয়েক হাজার মানুষের সমাগম হয় আদালতে।
বিশেষ করে সিলেটের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) এবং জেলা ও দায়রা জজ ভবনের দু একটি ফ্লোরে কয়েকটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু বাকি অনেক ফ্লোরসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নেই কোন সিসি ক্যামেরার তদারকি।
তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি স্থানের সিসি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকেও নেয়া হচ্ছেনা কোন কার্যকরী পদক্ষেপ। যার ফলে দিন সময় গড়ানোর সাথে সাথে আদালত পাড়ার নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলে। যতই দিন গড়াচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের সাথে সাথে নাশকতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে উদ্ব্যেগজনক হারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্যগজনকভাবে মব সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মবের শিকার হচ্ছেন নানা পেশার মানুষ। আদালত পাড়ায় যেন থেমে নেই মবের তান্ডব। আসামি থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাসহ বেশিরভাগ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন মবের আক্রমনে। বাদ যাচ্ছেনা সাবেক বিচারপতি, আইনজীবি, সেবাগ গ্রহীতাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহি-নীর সদস্যরা। এসব ঘটনার একশ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী অপরাধীরা নেতৃত্বে দিচ্ছে।
ফলশ্রুতিতে সিলেটের আদালত পাড়ায়ও ঘটেছে একাধিক হামলার ঘটনা। আসামিকে আদালতে হাজির করার সময় এবং তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করার সময় একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিগতদিনে সাবেক বিচারপতিসহ একাধিক অভিযুক্তরা আদালতে হামলার শিকার হন। এসব অপরাধের সাথে সম্পৃক্তরা এখনও চিহ্নিত না হওয়ায় রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাই কাউকে এখন পর্যন্ত কোন সম্ভব হয়নি আইনের খাঁচায়বন্ধি করার।
অপরদিকে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও রয়েছে যতেষ্ট চাপের সম্মুখিন।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন স্থানেও নাশকতার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ রাজশাহীতে বিচারকের বাসভবনে প্রবেশ করে তার সন্তানকে হত্যা ও পরিবারের সদস্যদের আহতের ঘটনায় দেশব্যাপি তুলপাড় চলছে। এতে করে বিচারক ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্যেগ সৃষ্টি হয়েছে সর্বত্র।
এদিকে, সিলেটে শনিবার মধ্যরাতে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে এম্বুলেন্সে এবং কুমার গাওঁ বাসস্টান্ডের একটি পরিত্যাক্ত বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুনে পুড়ে গেছে পরিত্যাক্ত বাস ও হাসপাতালের এম্বুলেন্সটি। এঘটনায় নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহ সচেতন নাগরিক মহলকে।
এসএমপির মূখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা সর্বত্র নিরাপত্তা জোরদার করেছি। আদালতে যতগুলো সিসি ক্যামেরা রয়েছে তা ঠিকমতো মেইনটেইন করলে হয়ে যেতে। আর আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।এছাড়াও আরো কিছু সংখ্যক ক্যামেরা লাগানোর কথা রয়েছে এবং নষ্টগুলো মেরামতের প্রক্রিয়া চলছে। সবগুলো ঠিকঠাক থাকলে একটা আদালতকে নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে আনা সম্ভব।
তবে এসএমপির ডিসি প্রসিকিউশান আহমাদ মাঈনুল হাসান বলেন, আমরা একাধিক সিসি ক্যামেরা দ্বারা আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষন করে যাচ্ছি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে আমাদরে নগর বিশেষ শাখাসহ অন্যান্য সদস্যরাও কাজ করছে।
চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির মো. ফাইজুল ইসলাম বলেন, আমাদের নিজস্ব কোন সিসি ক্যামেরা নেই। চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফ্লোরে বা এর কার্যকরী এলাকায় শুরু থেকে কোন সিসি ক্যামেরা ছিলনা। আমরা গণপূর্ত বিভাগের কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য পত্র দিয়েছি। গত ২৭ আগস্ট সিজেএম থেকে সিসি ক্যামেরার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে এই পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) জয় দেব বিশ্বাস বলেন, নষ্ট সিসি ক্যামেরাগুলো মেরামত ও আরো কিছু সংখ্যক সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষ থেকে আমরা পত্র পেয়েছি। আমরা সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। আশাকরি দ্রুত কাজ হয়ে যাবে।
সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, জেলা ও দায়রা জজের পর্যবেক্ষনে মোট ১১টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। তার মধ্যে ৫ ক্যামেরা দীর্ঘদিন থেকে নষ্ট হয়ে আছে। জেলা ও দায়রা জজ ভবন এবং সিজেএম ভবনের নীচতলায় সিড়ির সামনে পিছনে ৪টি, বিচারক কোয়ার্টার ও প্রধান ফটকে বাকিগুলো ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। একটি মাত্র ক্যামেরা মাঠে স্থাপন করা হয়েছে, তাও বিকল হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। বাকিগুলো কাজ করলেও মাঝেমাঝে একটু ডিসটার্ব করে। আমরা সিটি কর্পোরেশনকে জানিয়েছি নষ্ট ক্যামেরাগুলো যেন দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পর্যবেক্ষনে ৮টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। সিজেএম ভবনের ইনডোরে রয়েছে এই ক্যামেরা গুলো। যার মধ্যে ৩য় তলায় ৪ টি এবং ১০ম তলায় ৪টি।
আদালতের দায়িত্বে নিয়োজিত জেলা পুলিশের সুত্রে জানা গেছে, জেলা পুলিশের পর্যবেক্ষনে রয়েছে ৮টি সিসি ক্যামেরা। সবগুলো সিজেএম ভবনের ইনডোরে স্থাপিত রয়েছে। জেলা পুলিশের মালখানায় ৪টি এবং হাজতখানায় অপর ৪টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে।
এসএমপির কোর্ট প্রসিকিউশানের অধীনে রয়েছে ১১ টি সিসি ক্যামেরা। দুই প্রধান ফটক ও হাজত খানায় সিসি ক্যামেরা থাকলেও মাঠে নেই কোন ক্যামেরা।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাডভোকেট সরওয়ার আহমেদ চৌধুরী আবদাল বলেন, সিঁড়িসহ আদালতের প্রতিটি প্রবেশ দ্বারে সিসি ক্যামেরা স্থাপন জরুরী। আদালতে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ আসে। তাদের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থানে সিসি ক্যামেরা বসালে অপরাধীরা অপরাধ করলে সহজে তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যাবে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মো. আশিক উদ্দিন আশুক বলেন, আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন এখানে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। তাই আদালত প্রাঙ্গনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপনেরও অনুরোধ জানাচিছ। যে কোন ঘটনায় অভিযুক্তকে সহজে খোঁজে বের করতে সিসি ক্যামেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








