টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের চার জেলা সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বন্যার পদধ্বনি দেখা দিয়েছে| পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে এই এসব জেলার হাওরাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে| চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি ঝরেছে মৌলভীবাজার জেলায়| টানা বৃষ্টিপাতে ইতিমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী নদীর পানি| এ ছাড়া মনু, কংস ও জাদুকাটা নদীর পানিও বিপদসীমার কাছাকাছি।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ১৯০ মিলিমিটার রেকর্ড হয়েছে মৌলভীবাজার স্টেশনে| এরপর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ১৮০ মিলিমিটার রেকর্ড হয়েছে মৌলভীবাজারের শেরপুরে এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ১৭৭ মিলিমিটার| আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল ও আশে পাশের এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা ˆতরি হচ্ছে| মূলত এর প্রভাবেই ঝরছে টানা বৃষ্টি|
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) ও বাংলাদেশ বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের পরিমাণ রেকর্ড হয়|
এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ১৩৭ মিলিমিটার, কুলাউড়ায় ১৩৫ মিলিমিটার, তাহিরপুরে লাউড়েরগড়ে ১৩৩ মিলিমিটার, সিলেটে ১২৭.২ মিলিমিটার, মধ্যনগরের মহেশখোলায় ১০৬ মিলিমিটার, কমলগঞ্জে ১০৬ মিলিমিটার, হবিগঞ্জে ১০৪ মিলিমিটার, বড়লেখার দক্ষিণভাগে ১০৪ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জের ছাতকে ৭৬ মিলিমিটার, বড়লেখার লাতুতে ৭৫ মিলিমিটার, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চাঁদপুর চা বাগানে ৬২ মিলিমিটার, বিয়ানীবাজারের শেওলায় ৫৯ মিলিমিটার, ˆজন্তাপুরের লালাখালে ৫১ মিলিমিটার, গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ে ৪৬ মিলিমিটার ও জকিগঞ্জে ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে|
জানা গেছে, টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলাজুড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে| চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে মৌলভীবাজার জেলারই তিনটি স্থানে| জেলার হাকালুকি তীরবর্তী উপজেলাগুলোর হাওরে হু হু করে বন্যার পানি ঢুকছে| মৌলভীবাজারে টানা ভারী বৃষ্টিপাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে|
জেলার মনু, ধলই ও জুড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে| পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওর প্লাবিত হচ্ছে| গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় মৌলভীবাজারের জুড়ী নদীর পানি বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়| এছাড়া মুন নদীর পানিও বিপদসীমার কাছাকাছি রয়েছে|
কৃষকরা জানান, গত দুই দিনের অব্যাহত বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কোনো কোনো এলাকায় আগাম বন্যা দেখা দিয়েছে| এতে হাওরের পাশাপাশি জেলার নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে| পাকা বোরো ধান ঘরে তুলতে না পারায় কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে|
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরোধান চাষ করা হয়েছে| এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর চাষ করা হয়েছে হাওর এলকায়| হাওরে প্রায় ৭৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে| বাকি ধান নন হাওর এলকায় চাষ করা হয়েছে|
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে এই অঞ্চলে| আগামী ২ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে|
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, হাওর এলকায় ধান কাটা শেষের দিকে চলে এসেছে| আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে আমরা গত কয়েকদিন ধরে কৃষকদেরকে বলেছি, ধান দ্রুত কাটার জন্য| নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বোরোধান ডুবেছে| তবে কি পরিমাণ ধান ডুবেছে, তা জানা যায়নি|
এদিকে সুনামগঞ্জের মধন্যনগরের এরনবিল হাওরে (ইকরাছই হাওরে) বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে| সীমান্তের মনাই নদীতে চাপ বাড়ায় উপজেলার হামিদপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ সড়ক ভেঙে হাওরে পানি ঢুকছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন|
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, হাওরে ১১৪ হেক্টর জমি রয়েছে| এর মধ্যে ৪০ হেক্টর ধান কাটা হয়েছে| মধ্যনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় ঘোষ বলেন, এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নয়| হামিদপুর গ্রামের সড়ক| নেত্রকোনার দুর্গাপুর হয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সড়কটি ভেঙেছে| ইকারছই হাওরের বেশিরভাগ জমির ফসল কাটা শেষ| ৫ থেকে ১০ হেক্টরের মত জমির ফসল ডুবেছে| তবে ইউএনও জানান, ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে|
সিলেট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘন্টায় (সোমবার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত) সিলেট মহানগর এবং আশপাশ এলাকায় ১২৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে| মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২ মিলিমিটার| তবে সারাদিন সিলেটের আকাশ ছিল মেঘলা|
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় ও উজানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে| এর প্রভাবে আগামী তিনদিনের মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে|
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল ইসলাম শোভন সাক্ষরিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিনদিন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে| এতে সিলেট বিভাগের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে|
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, বুধবার পর্যন্ত ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটারের বেশি) বর্ষণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম| তিনি আরও জানান, উত্তর বঙ্গোপসার ও এর আশে পাশের এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য রয়েছে|
পূর্বাভাস আরও বলছে, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে| বাতাসের গতি থাকতে পারে ঘণ্টায় ৬০-৮০ কিলোমিটার| এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে|
আবাহওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে বৃষ্টির প্রবণতা বেশি থাকবে| আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের এই প্রবণতা থাকতে পারে| তবে ২ মে থেকে কমতে শুরু করবে|
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্তব্যরত কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, পানির সমতল বাড়লেও মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি| তবে আমরা আশঙ্কা করছি, বুধবার অতিক্রম করতে পারে|
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








