গেল বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিন সিলেট বিভাগের পুলিশের থানা-ফাঁড়ি ও অন্যান্য নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি লুট করে দুর্বৃত্তরা। তবে একবছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা দেখাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তথ্যমতে, গণঅভ্যুত্থানের দিন সিলেট বিভাগের পুলিশের থানা-ফাঁড়ি ও অন্যান্য নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ১৩২টি অস্ত্র লুট করে দুর্বৃত্তরা। পাশাপাশি লুট করা হয়েছে বিপুল পরিমান গুলি। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের বাসা থেকে লাইসেন্স করা অস্ত্রও লুট হয়েছে। এই অস্ত্রগুলো পরবর্তীতে হাতবদল হয়ে পেশাদার অপরাধী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী গ্রুপ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের হাতে চলে যায়। আর এসব লুট হওয়া অস্ত্র বর্তমানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং হত্যাকা-ে নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, লুন্ঠিত অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়ায় আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। যেটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় হুমকি বলে মন্তব্য তাদের।
গত বছরের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিলে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মীসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে গুলি করা অবস্থায় অস্ত্রধারীদের ছবি ও ভিডিও প্রকাশিত হয়। তবে এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত ১১৬টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের অনেকেই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতে জনসাধারণের মাঝে হতাশা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যা নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা জাগাচ্ছে।
নির্বাচনের মাত্র মাস খানেক বাকি রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধারে কোনো বিশেষ অভিযান চালানো হয়নি। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এরইমধ্যে লুট হওয়া ১১৬টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। বাকিগুলো উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, গেল বছরের ৪ আগস্ট নগরের জিন্দাবাজার, জেল রোড ও বন্দরবাজারে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে, অথচ আজ পর্যন্ত কেউ ধরা পড়েনি। এখন আবার নির্বাচন সামনে, তাই মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভীত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব ভূমিকা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে বলেও তিনি জানান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, ‘গত বছরের ৪ আগস্টের ঘটনার তদন্ত এখনও চলমান। আমরা প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখছি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেট্রোপলিটন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
র্যাব-৯ এর অধিনায়ক তাজমিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সিলেট বিভাগের ১০৭টি লুন্ঠিত অস্ত্রের একটি তালিকা আমরা হাতে পেয়েছি। এর মধ্যে ৬৫টি উদ্ধার করেছি। বাকিগুলো উদ্ধারে আমরা চেষ্টা করছি।
সিলেট রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘নির্বাচনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এরই মধ্যে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আমরা জেলাজুড়ে ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক অপারেশন ডেভিল হান্ট-২ নামে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছি। এ ছাড়া এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে। এ নিয়ে জনসাধারণের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনে জামায়েতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করলে নির্বাচন সহিংসতায় রঙিন হবে। সরকারকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো জনগণ ফের আন্দোলনে নামবে। এখন পর্যন্ত তালিকাভূক্ত কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী কিংবা অবৈধ অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, যা আগামী নির্বাচনে প্রভাব পড়বে বলে মনে করছি।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








