ঈদ ভ্রমণে পর্যটকের প্রথম পছন্দ
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০১:০৭ PM

ঈদ ভ্রমণে পর্যটকের প্রথম পছন্দ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/০৩/২০২৬ ১২:০৫:৫২ PM

ঈদ ভ্রমণে পর্যটকের প্রথম পছন্দ


সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, দিগন্তজোড়া চা-বাগানের কার্পেট আর মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুরি—প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটকে। প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মুছতে লাখো পর্যটকের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে এই ‘প্রকৃতিকন্যা’। ২০২৬ সালের এই ঈদ মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না; ইতিমধ্যে সিলেটের হোটেল-মোটেলগুলোতে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পাঠকদের জন্য সিলেটের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোর ভৌগোলিক ইতিহাস, ঐতিহ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থা তুলে ধরা হলো।

জাফলং : পিয়াইন নদীর তীরে পাথুরে মিতালি
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত জাফলং পর্যটকদের কাছে ‘প্রকৃতিকন্যা’ হিসেবে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে এর অবস্থান।জাফলং মূলত একটি পলল ভূমি। ডাউকি ও পিয়াইন নদী মেঘালয় পাহাড় থেকে কোটি কোটি বছর ধরে যে পাথর ও পলি বহন করে এনেছে, তা-ই আজকের এই পাথুরে জাফলংয়ের জন্ম দিয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে এটি ছিল জৈন্তা রাজ্যের অংশ। এখানকার খাসিয়া পুঞ্জিগুলো আজও তাদের আদিম সংস্কৃতি ও মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এখানকার মূল আকর্ষণ হলো নদীর স্বচ্ছ জল, পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা মেঘ এবং চা-বাগান। বল্লাঘাটের পাথরের স্তূপ আর ওপারে ডাউকি নদীর ওপর ঝুলন্ত ব্রিজ পর্যটকদের বিমোহিত করে। সিলেট শহরের কদমতলী বা আম্বরখানা থেকে বাসে অথবা সিএনজি রিজার্ভ করে জাফলং যাওয়া যায়। জাফলং জিরো পয়েন্টে যেতে চাইলে নৌকা ভাড়া করতে হয় ।

ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর : বাংলার কাশ্মীর
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর বর্তমানে সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট। ধলাই নদীর মোহনায় এই স্পটটির অবস্থান। ধলাই নদী ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসার সময় প্রচুর সাদা পাথর নিয়ে আসে। এই পাথরগুলোই ভোলাগঞ্জের প্রধান সৌন্দর্য। ব্রিটিশ আমলে এই পাথর উত্তোলনের জন্য এখানে রোপওয়ে বা রজ্জুপথ তৈরি করা হয়েছিল, যা আজ ঐতিহ্যের অংশ। এর ওপারেই ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড়ের অবস্থান। সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হিমশীতল নীল জলরাশি এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা করে। এখানকার পাথর কোয়ারিগুলো সিলেটের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। সিলেট আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে বিআরটিসি এসি বাস বা লোকাল বাসে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জিরো পয়েন্টে যেতে হয়। সেখান থেকে নৌকা দিয়ে মূল সাদা পাথর স্পটে যাওয়ার সরকারি রেট ৮০০ টাকা (যাওয়া-আসা)।

রাতারগুল : জলমগ্ন বন বা ‘বাংলার আমাজন’
গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন (Swamp Forest)। প্রায় ৩,৩১২ একর আয়তনের এই বনটি বছরের সাত মাস পানির নিচে থাকে। মূলত চেঙ্গী খাল ও পিয়াইন নদীর প্লাবন ভূমিতে এই বনের উৎপত্তি। এটি একটি সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বন, যেখানে হিজল, করচ ও বরুণ গাছের আধিক্য দেখা যায়।

ডিঙি নৌকায় বনের ভেতরে গহিন অরণ্যে ঘুরে বেড়ানো এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, পাখি এবং জলজ প্রাণীর বিচরণ একে জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সিলেট শহর থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে গোয়াইনঘাটের মটরঘাট যেতে হবে। সেখান থেকে বনের ভেতরে ঘোরার জন্য সরকারি নির্ধারিত ডিঙি নৌকা ভাড়া নিতে হয় ।

বিছনাকান্দি ও পান্তুমাই : পাহাড় আর ঝরনার মেলবন্ধন
মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পাথুরে বিছানার মতো বিছিয়ে থাকা একটি জলপ্রপাত হলো বিছনাকান্দি। এটি মূলত পিয়াইন নদীর একটি শাখা। পাহাড়ের অনেকগুলো খাঁজ এসে এক জায়গায় মিলিত হয়েছে বলে একে ‘বিছনাকান্দি’ বলা হয়। এর পাশেই অবস্থিত পান্তুমাই গ্রাম, যা বাংলাদেশের সুন্দরতম গ্রামগুলোর একটি। এখানে ভারতের সীমান্ত থেকে আসা বড়হিল ঝরনাটি দেখা যায়। এখানে পাথর ও পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী জলধারা এক শান্তিময় পরিবেশ তৈরি করে। সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়গুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে। আম্বরখানা থেকে সিএনজিতে করে হাদারপাড় বাজার যেতে হয়। এরপর ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে বিছনাকান্দি ও পান্তুমাই ঘুরে আসা যায়।

শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার
সিলেটকে বলা হয় ‘৩৬০ আউলিয়ার দেশ’। আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে এর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেন থেকে আসা হযরত শাহজালাল (রহ.) এবং তাঁর ভাগ্নে হযরত শাহপরান (রহ.) সিলেটে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তাঁদের মাজারগুলো আজ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এক পবিত্র তীর্থস্থান।মাজার সংলগ্ন গহিন পুকুরের গজার মাছ, জালালি কবুতর এবং ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলী সিলেটের ইতিহাসের সাক্ষী। সিলেট শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে রিকশা বা সিএনজিতে দরগাহ গেটে পৌঁছানো যায়।

সিলেটে আগত পর্যটকদের জন্য বিলাসবহুল থেকে শুরু করে সাশ্রয়ী সব ধরনের হোটেলের সুব্যবস্থা রয়েছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ, সিলেট রিজিয়ন এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, উৎপল কুমার চৌধুরী, পিপিএম বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে সিলেট রিজিয়নের অন্তর্গত জাফলং, সাদা পাথর, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, শ্রীমঙ্গল, মাধবকুণ্ড ও সুনামগঞ্জের লাকমাছড়া নীলাদ্রি লেকসহ সকল পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট রিজিয়ন সর্বদা সজাগ রয়েছে। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় প্রতিটি স্পটে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং ইভটিজিং বা যেকোনো ধরনের হয়রানি রোধে মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক টহলরত থাকবে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নৌ-ভ্রমণ ও পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে চলাচলে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা কৃত্রিম সংকট তৈরি রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কোনো পর্যটক হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের হটলাইন নম্বর ও কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। আমরা গণমাধ্যম ও সচেতনতামূলক লিফলেটের মাধ্যমে পর্যটকদের অনুরোধ করছি তারা যেন অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার গ্রহণ না করেন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলেন। সিলেট বিভাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে পর্যটকদের ভ্রমণ আনন্দদায়ক ও নিরাপদ রাখতে ট্যুরিস্ট পুলিশ বদ্ধপরিকর।

পাহাড়ের নীল আর পানির স্বচ্ছতা যদি একসাথে উপভোগ করতে চান, তবে এবারের ঈদে সিলেট আপনার শ্রেষ্ঠ গন্তব্য হতে পারে। তবে ভ্রমণের সময় যত্রতত্র প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে এই সুন্দর প্রকৃতিকে নষ্ট না করার অনুরোধ স্থানীয় প্রশাসনের।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর