প্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ছে মানবদেহে, তিমির পেটেও
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১০:০৫ AM

প্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ছে মানবদেহে, তিমির পেটেও

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫/০৫/২০২৬ ০৯:১১:০৭ AM

প্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ছে মানবদেহে, তিমির পেটেও


সকাল সাড়ে সাতটা। ঢাকার উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের একটি স্কুলের সামনে তখন অভিভাবকদের ভিড়। ছোট ছোট শিশুদের হাতে টিফিন বক্স, পিঠে ব্যাগ, আর বেশিরভাগের ব্যাগের পাশেই ঝুলছে রঙিন প্লাস্টিকের পানির বোতল। ছয় বছর বয়সী আয়ানও তাদের একজন।

স্কুল গেটে ঢোকার আগে মা নুসরাত জাহান ছেলের পানির বোতলটা ঠিক করে দিলেন। প্রতিদিনের মতোই বাসা থেকে পানি ভরে দিয়েছেন তিনি।

নুসরাত বলেন, ‘স্কুলে বাইরের পানি খেতে দেই না। বাসার পানি নিরাপদ।’

কিন্তু যে বোতলে তিনি নিরাপদ পানি দিয়েছেন, সেটিই এখন বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট এবং ডিসপোজেবল কাপ থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পানীয় জল, খাদ্যশৃঙ্খল, এমনকি বাতাসেও পাওয়া যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বৈশ্বিকভাবে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে এখনো মানুষের শরীরে এর চূড়ান্ত প্রভাব নিয়ে গবেষণা সীমিত।

বাংলাদেশে যেখানে প্রায় দুই দশক আগে নিষিদ্ধ হওয়া পলিথিন এখনো বাজার, রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল সবখানেই অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখন শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বড় ঝুঁকি।

২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটি, যারা এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর ৬ক ধারায় সরকারকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। সেই ধারার আওতায় পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, বিক্রি, ব্যবহার ও পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়।

আইনে শাস্তির ব্যবস্থাও কঠোর। উৎপাদন বা বাজারজাত করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু ঢাকার কাঁচাবাজারে গেলে সেই আইন যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ। কারওয়ান বাজারে মাছ কিনতে আসা এক ক্রেতার হাতে একের পর এক পণ্য পলিথিনে তুলে দিচ্ছিলেন দোকানদার। সবজি, মাছ, মরিচ সব আলাদা পাতলা পলিথিনে ভরা হচ্ছে।

দোকানদার সোহেল মিয়া বলেন, ‘মানুষ পলিথিন ছাড়া নিতে চায় না। কাপড়ের ব্যাগ আনে না কেউ। কাগজের ব্যাগ দিলে খরচ বেশি, তাই আমরাও নিরুপায়।’

একই দৃশ্য কুড়িল, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে রাজধানীর প্রায় সব বাজারেই।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৭০০ থেকে ৩০০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার বড় অংশই সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি-এর বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১৯ থেকে ২৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য জলজ বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশ করে, যা নদী ও সমুদ্র দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ।

সমুদ্র গবেষণায় দেখা গেছে, ডলফিন, তিমি, কচ্ছপসহ শতাধিক সামুদ্রিক প্রাণীর পাকস্থলিতে প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে মৃত তিমির পেটে ৩০-৪০ কেজি পর্যন্ত প্লাস্টিক পাওয়া যাওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, এই প্লাস্টিক কণা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ছোট মাছ থেকে বড় সামুদ্রিক প্রাণীতে প্রবেশ করছে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্য ব্যবস্থায়ও ঢুকে পড়ছে।

পরিবেশ আন্দোলনের পরিচত মুখ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, যিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা ছিলেন; তার সময়ে পলিথিনবিরোধী অভিযান বাড়লেও বাজার বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি।

ঢাকার রাস্তায় কয়েক ঘণ্টা হাঁটলেই বোঝা যায়, প্লাস্টিক এখন মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে ঢুকে গেছে। রাস্তার পাশে চা বিক্রি হচ্ছে প্লাস্টিক কাপে। গরম ভর্তা ও তরকারি তুলে দেওয়া হচ্ছে পাতলা পলিথিনে।

গর্ভবতী নারী সুমি আক্তার বলেন, ‘এসব যে ক্ষতি করতে পারে, এটা কখনো ভাবিনি। আমরা তো প্রতিদিনই ব্যবহার করি।’

২০২০ সালে নেচার ফুড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বের হতে পারে। গরম পানি ব্যবহার করলে সেই কণার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শিমুল আহমেদ বলেন, ‘শিশুরা শরীরের ওজনের তুলনায় বেশি এক্সপোজারের মধ্যে থাকে। তারা প্রতিদিন প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।’

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর গবেষকেরা ৬২টি মানব প্লাসেন্টা পরীক্ষা করে প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পান। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় পলিইথাইলিন, যা পলিথিন ব্যাগ ও খাবারের প্যাকেটে ব্যবহৃত হয়।

গবেষকেরা সতর্ক করে বলেন, এই কণা ভ্রূণের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘বিদেশে এখন মানুষের রক্ত, ফুসফুস, এমনকি প্লাসেন্টায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ বিষয়ে গবেষণা প্রায় নেই। আমরা আসলে জানিই না আমাদের শরীরে কত প্লাস্টিক যাচ্ছে।’

ডা. আয়শা কবির বলেন, ‘গর্ভবতী নারীরা প্রতিদিন কতভাবে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছেন সেটা আমরা হিসাবই করছি না।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপের সংস্পর্শে এলে নিম্নমানের প্লাস্টিক থেকে রাসায়নিক বের হয়ে খাবারে মিশতে পারে, যা হরমোন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

বিশ্বের অনেক দেশ এখন প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। জার্মানিতে বোতল ফেরত দিলে টাকা ফেরত পাওয়া যায়, দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্জ্য আলাদা না করলে জরিমানা হয়, আর রুয়ান্ডা প্রায় সম্পূর্ণভাবে পলিথিন নিষিদ্ধ করেছে।

বাংলাদেশ একসময় পলিথিন নিষিদ্ধ করে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল। কিন্তু দুই দশক পরও সেই নিষিদ্ধ পলিথিনই এখন বাজার, নদী, খাবার আর মানুষের শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

স্কুলের সেই শিশু আয়ান হয়তো এখনো জানে না, প্রতিদিন তার হাতে তুলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। তার মা নুসরাতও জানেন না। বাংলাদেশেও নেই এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা ও জনসচেতনতা, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় অজানা ঝুঁকি তৈরি করছে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর