আনচেলত্তি ‘বাবার মতো’, তার পরিকল্পনায় আস্থা রদ্রিগোর
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১২:৩৪ PM

আনচেলত্তি ‘বাবার মতো’, তার পরিকল্পনায় আস্থা রদ্রিগোর

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯/০৬/২০২৬ ০৯:৫৫:৩৩ AM

আনচেলত্তি ‘বাবার মতো’, তার পরিকল্পনায় আস্থা রদ্রিগোর


রদ্রিগো সিলভা দে গোয়েস, যিনি রদ্রিগো নামেই বেশি পরিচিত। ইনজুরির কবলে পড়ে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে ছিটকে পড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা খেলোয়াড়। সান্তোসের যুব একাডেমি থেকে উঠে আসা রদ্রিগো ২০১৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি ক্লাবটির হয়ে একাধিক লা লিগা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং অন্যান্য শিরোপা জিতেছেন। বিশেষ করে ২০২১-২২ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তের জোড়া গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের নায়ক হন। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলের ইতালীয় কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে রদ্রিগোর রিয়াল মাদ্রিদে খেলার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

ইংরেজি থেকে অনূদিত লেখাটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনাল। সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। গ্যালারিতে ৬০ হাজারেরও বেশি দর্শক, আর ম্যানচেস্টার সিটি তখন ১-০ গোলে এগিয়ে। আমি তখন রিয়াল মাদ্রিদের বেঞ্চে বসেছিলাম। ঠিক তখনই কার্লো আনচেলত্তি আমাকে ডাকলেন। মাঠে নেমে আক্রমণাত্মক খেলতে এবং ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে বললেন।

আমি ৬৮তম মিনিটে মাঠে নামি। ৯০তম মিনিটে গোল করে সমতা ফেরাই, যদিও দুই লেগ মিলিয়ে তখনও আমরা পিছিয়ে। খেলা আবার শুরু হওয়ার পরের মিনিটেই আরেকটি গোল করে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাই। শেষ পর্যন্ত আমরা জিতেছিলাম, আর বাকিটা ইতিহাস—ফাইনালে লিভারপুলকে হারিয়ে আরেকটি শিরোপা।

এই ঘটনাটি বলার কারণ, একজন কোচ একটি দলের যাত্রাপথে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারে কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন, তা বোঝানো। তাদের অনেক কাজই জনসমক্ষে আসে না।

আনচেলত্তির অধীনে খেলোয়াড় হিসেবে আমার নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি মনে করি, খেলোয়াড়দের জন্য তার পদ্ধতি বোঝা সহজ, কারণ ফুটবলের প্রকৃত বাস্তবতা ক্যামেরার সামনে নয়, বরং পর্দার আড়ালে গড়ে ওঠে।

ড্রেসিংরুমের বাইরে থাকা মানুষ কিংবা সংবাদমাধ্যমের জন্য তিনি কী করবেন, তা অনুমান করা কঠিন। স্বাভাবিকভাবেই তারা বিভ্রান্ত হয়, কারণ তারা একরকম সিদ্ধান্তের আশা করে, আর তিনি নেন সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্ত।

তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভেবেচিন্তে নেওয়া। গভীর কৌশলগত জ্ঞান এবং দল পরিচালনার অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে হৃদয় ও মস্তিষ্কের সমন্বয় ঘটিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেন।

সোমবার জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ সামনে। আমার বিশ্বাস, ব্রাজিলের সমর্থকেরা, বিশেষ করে যারা সম্প্রতি তার ভাবনা-দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তারা ধীরে ধীরে ‘মিস্টার’র কাজের প্রতি আরও আস্থা রাখবেন।

আমাদের কাছে আনচেলত্তি অনেকটা বাবার মতো। কোচ হিসেবে যেমন, মানুষ হিসেবেও তাকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি। মাঠের ভেতর-বাইরের নানা বিষয় নিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেন, পরামর্শ দেন।

শুনেছি, তাকে নিয়ে একটি সিরিজ বা তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, সেটি অসাধারণ হবে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রের কারণে ক্লাব ও জাতীয় দলের ভেতরের অনেক কিছুই মানুষ জানতে পারছে, যা আগে কেবল বহু বছর পরে প্রকাশিত আত্মজীবনী বা লেখালেখির মাধ্যমে জানা যেত।

তবুও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ড্রেসিংরুম কিংবা বৈঠককক্ষের গোপন পরিবেশেই থেকে যায়। আর সেখানেই একজন প্রকৃত পথপ্রদর্শকের মহত্ত্ব সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে—পরিবার নিয়ে কথোপকথনে, অসন্তোষ দূর করার আলোচনায় কিংবা সঠিক পথ দেখাতে প্রয়োজনীয় কঠোরতায়।

আমার বাবা ছাড়া প্রথম যে কোচ আমার সম্ভাবনা চিনেছিলেন, তিনি ছিলেন এরিক গোজ—সাবেক ফুটবলার, যিনি আজও আমাকে আরও উন্নতির জন্য অনুপ্রাণিত করেন।

তখন আমার বয়স মাত্র ছয় বছর। সাও পাওলোর উপকণ্ঠের ওসাসকো শহরে বয়সে অনেক বড় ছেলেদের সঙ্গে রাস্তায় ফুটবল খেলতাম। তারা স্থানীয় এক একাডেমিতে অনুশীলন করত, কিন্তু আমি তখনও সেখানে ভর্তির মতো বয়সে পৌঁছাইনি।

একদিন সেই একাডেমির কোচ আমাদের খেলা দেখতে থামলেন। খেলা শেষে তিনি আমাকে ডাকলেন, ছবি তুললেন এবং পৌর টুর্নামেন্টে পাড়ার দলের হয়ে আমার নাম নিবন্ধন করলেন, যদিও আমার বয়স অন্যদের অর্ধেক।

সেদিনই বুঝেছিলাম, বাবা ঠিকই বলেছিলেন—সফল হতে হলে বড়দের বিপক্ষে খেলতে হবে এবং সেরাদের হারাতে হবে।

সান্তোসের বয়সভিত্তিক দলে থাকার সময় আমি প্রায়ই সিনিয়র দলের খেলা দেখতাম। স্বপ্ন দেখতাম, একদিন আমিও সেই জার্সি গায়ে ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামে নামব, আর দর্শকেরা আমার নাম ধরে চিৎকার করবে।

সেই পথ দেখিয়েছিলেন জাইর ভেনচুরা। ২০১৭ সালে তিনিই আমাকে মূল দলে সুযোগ দেন। যেন জানালাগুলো খুলে দিয়েছিলেন, যাতে আলো ঢোকে আর আমি নিজের প্রতিভা দেখাতে পারি।

জাইর সব সময় খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত জীবন ও স্বপ্ন জানার চেষ্টা করতেন। একদিন তাকে বলেছিলাম, আমার অন্যতম স্বপ্ন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলা। তিনি আমার কথায় বিশ্বাস করেছিলেন এবং এরপর আমি আরও বেশি সুযোগ পেতে শুরু করি।

কয়েক ডজন ম্যাচের পর ২০১৮ সালে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে প্রস্তাব এলে প্রথম যাদের জানিয়েছিলাম, তাদের একজন ছিলেন ভেনচুরা।

২০২২ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের তৎকালীন কোচ তিতে এক খেলোয়াড়কে নিয়ে ভেনচুরার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখন ভেনচুরা আমার প্রসঙ্গ তোলেন, আমার খেলার ধরন ও শক্তির দিকগুলো ব্যাখ্যা করেন।

ভেনচুরা বলেন, আমি ছিলাম আলাদা ধরনের খেলোয়াড়, আর তার কাজ ছিল শুধু আমাকে পেশাদার ফুটবলে তুলে আনা। তিনি হয়তো বুঝতে পারেন না, এই ‘শুধু’ শব্দটিই একজন খেলোয়াড়ের জীবনে সবকিছু বদলে দিতে পারে।

এর কিছুদিন পরই আমি প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের সিনিয়র দলে ডাক পাই। এরপর পুরো বিশ্বকাপ চক্রে তিতের পরিকল্পনায় ছিলাম এবং কাতার বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিই।

সম্প্রতি নিউইয়র্কে স্পোরটিভির ‘সেলেসাঁও কোপা’ অনুষ্ঠানের আড়ালে লুইজ ফেলিপে স্কলারির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তখনই বুঝতে পারলাম কেন ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলকে ‘স্কলারি পরিবার’ বলা হয়।

ফেলিপাঁও ফুটবলকে কেবল খেলা হিসেবে নয়, সত্যিকারের মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জায়গা হিসেবে দেখেন। তিনি খেলোয়াড়দের সবার আগে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেন—তাদের গুণ, দুর্বলতা, সম্ভাবনা, শেখার ক্ষমতা এবং অনিশ্চিত আচরণসহ।

এ পর্যন্ত আমার পথচলায় বিশ্বের সেরা অনেক কোচের অধীনে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। জিনেদিন জিদান, ফের্নান্দো দিনিজ, জাবি আলোনসো এবং আলভারো আরবেলোয়ার মতো মানুষদের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞ।

এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার রিয়াল মাদ্রিদে ফিরতে চাই। হোসে মরিনিয়োর অধীনে খেলার ব্যাপারেও আমি আশাবাদী। আমাদের আবার শিরোপা জেতানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব গুণই তার রয়েছে।

ফুটবলের মতো তীব্র প্রতিযোগিতামূলক জগতে ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ নামে পরিচিত একজন কোচের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় না থেকে উপায় নেই।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর