সিসিকের মেয়র প্রার্থী মনোনয়নে অন্তর্দ্বন্দ্বে জামায়াত
মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:১১ PM

স্থানীয় নেতাদের তোপের মুখে কেন্দ্রীয় নেতারা, নেপথ্যে এনজিও ব্যবসা

সিসিকের মেয়র প্রার্থী মনোনয়নে অন্তর্দ্বন্দ্বে জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১/০৮/২০২৬ ১১:৩৭:০৫ AM

সিসিকের মেয়র প্রার্থী মনোনয়নে অন্তর্দ্বন্দ্বে জামায়াত


সিলেট সিটি কর্পোরেশনে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে  বিপাকে পড়েছে দলটি। নির্বাচন করতে ইচ্ছুক সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নয়, এখন দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর শাখা পরস্পর বিরোধী শিবিরে অবস্থান করছে। এনিয়ে জামায়াতের শ্রমিক ও ছাত্র সংগঠনের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে আগে ভাগেই সারাদেশে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। তারা যেকোনমূল্যে সিংহভাগ নগর ভবন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। এর থেকে ব্যাতিক্রম নয় সিলেটও। ইতিমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে দলের সিলেট মহানগর শাখা সদস্য (রুকন) ও তৃণমূল পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের মতামত নিয়ে মেয়র প্রার্থীর জন্য তিন সদস্যের একটি প্যানেল কেন্দ্রে প্রেরণ করে স্থানীয় সংগঠন।


জামায়াতের দলীয় সুত্রে জানা যায়, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দলের সিলেট মহানগর শাখার আমীর মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদের নাম প্যানেলে রয়েছে।


এর মধ্যে মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম  বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা: শফিকুর রহমানের আপন ছোট ভাই। তিনি দলটির নিয়ন্ত্রণাধীন সিলেট উইমেনস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়।


আর মাওলানা হাবিবুর রহমান সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট ১ সংসদীয় আসন থকে জামায়াত মনোনীত ১১দলীয় ঐক্যের পক্ষে প্রতিদ্বন্ধিতা করে পরাজিত হন। এর আগে তিনি সিলেট ৬ আসনেও জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি ইবনে সিনা হাসপাতাল সিলেটের ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান।তাঁর বাড়ি গোলাপগঞ্জে।


প্যানেলের অপর প্রার্থী মাওলানা লোকমান আহমদ মহানগর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতা ও সিলেট জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি।দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তিনি।


জামায়াতের প্যানেলে থাকা তিনজন প্রার্থীর মধ্যে দুইজন প্রার্থীরই আদি নিবাস মহানগর এলাকার বাহিরে।


দলটির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জামায়াতের তৃণমূলের কর্মীরা এই তিন নেতার যেকোনো একজনকে মনোনয়ন দিলে জয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদি। তবে এখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান সহ দলটির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা।


এসব বিষয় সুরাহা করতে সম্প্রতি সিলেট সফর করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি মহানগর মজলিশে শূরার বৈঠক ডেকে কেন্দ্রীয় আমীরের মনপুত সাবেক ছাত্রনেতা ও সিলেট শিবিরের সাবেক সভাপতি ড. আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপুর নাম সভায় উথাপন করেন।


বৈঠকে তিনি স্থানীয় নেতাদের জানান যে, অপেক্ষাকৃত তরুণ এই নেতাকে আসন্ন সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্ধন্ধিতা  করাতে আগ্রহী আমীরে জামায়াত। বিষয়টি উপস্থাপনের পর মহানগর মজলিশে শূরার বৈঠকে উপস্থিত থাকা নেতারা মনোক্ষুণ্ণ হন এবং আমীরের এমন স্বৈরাতান্ত্রিক আগ্রহকে তারা দলের সার্কুলার, ঐতিহ্য ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী উল্লেখ করে উপস্থিত স্থানীয় নেতারা বলেন, কেন্দ্র যাকে ইচ্ছা তাকে মনোনয়ন করুক,আমাদের জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই।


মজলিসে শূরার এই বৈঠকে স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রীয় নেতার সম্মূখে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে স্থানীয় নেতাদের তোপোর মূখে এই কেন্দ্রীয় নেতা সিদ্ধান্তহীনভাবেই সভা শেষ করতে বাধ্য হন।


জামায়াত আমীরের পছন্দের মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপু মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে ফিলিপাইনে অধ্যাপনা করছেন, পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড এসেম্বলী অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামী) নামে একটি বিদেশি এনজিও'র সাথেও সম্পৃক্ত রয়েছেন।


অনুসন্ধানে জানা যায়, সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্বীকৃত ও জাতিসংঘের সদস্য ভূক্ত এনজিও সংগঠন ওয়ার্ল্ড এসেম্বলী অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামী) দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশে কাজ করছে। এর কান্ট্রি ডাইরেক্টর হিসেবে রয়েছেন ২০০১ সালে সিলেট মহানগর শিবিরের সভাপতির দায়িত্বপালন করা ড. রেদোয়ানুর রহমান। এই ওয়ামী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিম যুবসমাজের উন্নয়নে কাজ করলেও বাংলাদেশে কার্যক্রমের শুরু থেকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে কাজ করছে এবং দলটিকে ফান্ড দিচ্ছে। সাবেক শিবির নেতা এর দায়িত্বে থাকার সুবাধে এই এটি এখন পুরোপুরী জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে চলছে। ফলে প্রায় এক দশক পূর্বে বাংলাদেশের ৮টি ইসলামিক রাজনৈতিক দল বিষয়টি নিয়ে সৌদিআরব সরকারের কাছে অভিযোগও করেছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ওয়ামী বিশ্বজুড়ে মুসলিম যুবসমাজের উন্নয়নের জন্য কাজ করলেও বাংলাদেশে কার্যক্রমের শুরু থেকেই তারা জামায়াতের ইসলামের কর্মীদের জন্য কজ করছে। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে ফান্ড কালেকশন করে বিগত আওয়ামী রেজিমের সময়ে শুধুমাত্র হামলা-মামলা ও জুলুম নির্যাতনের শিকার জামায়াত কর্মী ও তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এমনকি সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীদেরকে বড় অংকের ফান্ড দিয়েছে।


সিসিকে দলটির প্রার্থী নির্বাচনে ওয়ামীর বাংলাদেশর পরিচালক ওয়ামী'র ফিলিপাইনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপুকে দলীয় মনোনয়ন দিতে ড. রেদোয়ানের নেতৃত্বে একটি এনজিও সিন্ডিকেট কাজ করছে। আর যেহেতু এনজিও'টি জামায়াতকে ফান্ড দেয় তাই জামায়াতের আমীর সহ কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের পরামর্শের বাহিরে যেতে পারছেন না।


শুধু ঢাকায় নয়, সিলেটেও তৎপর এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। জামায়াত আমীরের ঘনিষ্টবন্ধু একজন সাংবাদিক নিজেকে এনজিওতে ওয়ামী থেকে ফান্ড পাওয়ার আশায় আমীরে জামায়াতকে এনজিওটির এই প্রার্থীকে সিসিকের মেয়রপদে মনোনয়ন দিতে প্রলুব্ধ করছেন। আর এর পেছেনে রয়েছে এনজিও ও ডোনেশন ব্যবসা।


মেয়র মনোনয়ন নিয়ে কেন্দ্র ও স্থানীয় সংগঠনের মধ্যে চরম দ্বন্ধের কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট মহানগর শাখার একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দল এখন বুর্জোয়া রাজনীতি করছে, এখন কোথাও কোনো নিয়মনীতি প্রতিপালন হয় না।


মহানগরের মজলিসের শুরার এক সদস্য জানান, শুরা সদস্য কেউ চাচ্ছে না টিপুকে মনোনয়ন দিতে। তিনি কেন্দ্রীয় সংগঠনের উদ্ভট এই চিন্তাকে বাড়াবাড়ি বলে অভিহিত করেন।


তবে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী দলীয় কোন্দল ও এনজিও সিন্ডিকেটের কথা অস্বীকার করে আজকের সিলেটকে বলেন, সংগঠন হয়তো বা তৃণমুলের মতমতকে রিভাইজ করছে যে কারণে প্রার্থীদের বিষয়ে আরো যাচাই বাছাই করছে।


মজলিসে শুরা বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, সংগঠনের প্রার্থীতার বিষয়ে শুরা কোন সিদ্ধন্ত নেয় না, সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় সংগঠন। সিলেটের দায়িত্বশীল হিসেবে এডভোকেট জোবায়ের শুরায় বৈঠকে সকলের মতামত নিয়েছেন, তবে এই বৈঠকে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।


এনজিও সিন্ডিকেটের বিষয়ে তিনি বলেন, কোন এনজিও'ই সংগঠন বা আমীরে জামায়াতের মতামতের উপর প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ নেই।

আজকের সিলেট//জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর