কেমন আছেন সেই দাপুটে তারকারা?
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৩ AM

কেমন আছেন সেই দাপুটে তারকারা?

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬/১১/২০২৪ ১২:৫৬:৫৬ PM

কেমন আছেন সেই দাপুটে তারকারা?


বিগত দেড় দশকের আওয়ামী ফ্যাসিজমের বয়ান নির্মাণে হাতিয়ার করা হয়েছিল সংস্কৃতি অঙ্গনকেও। দলীয়করণ ও আত্তীকরণ থেকে বাদ যায়নি বিনোদন জগৎ। একসময় পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আসাদুজ্জামান নূর, রিয়াজ, মৌ আর শমী কায়সারের মতো শিল্পীদের ছিল সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা।

অথচ বিগত দেড় দশকে তারাই হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক লাঠিয়াল। সংসদ সদস্যপদ, রাজউকের প্লট, সরকারি অনুদান, পদ-পদবি পেতে অনেকেই তাদের শিল্পী সত্ত্বা বিসর্জন দেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বিনোদন জগতের সেই তারাদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে গেছেন। কেউ বিদেশে চলে গেছেন, কেউ আবার দেশেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন। কেউ কেউ আবার গ্রেফতার হয়ে কারাগারেও আছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন ব্যক্তির একাধিক পরিচয় বা ভূমিকা থাকতে পারে। তিনি শিল্পীর পাশাপাশি রাজনীতিও করতে পারেন। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে পুরো বিনোদন জগৎকে দলীয়করণ করা হয়েছে। তাই তারকাদের গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছে।

গত বছর ১৪ নভেম্বর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের উপস্থাপক চিত্রনায়ক ফেরদৌস স্লোগান তোলেন ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার। আপনাকে আমাদের বারবার দরকার। চিরকাল আপনাকে আমাদের দরকার। আমাদের সবকিছু দিয়ে, মনপ্রাণ দিয়ে আমরা আপনাকে চাই। আপনি ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। বাংলাদেশ আপনার হাতেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ।’

রাষ্ট্রীয় একটি অনুষ্ঠানকে একটি দলের রাজনৈতিক প্রচারণার কর্মীসভা হিসেবে তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এরপরেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ঢাকা-১০ আসনে আওয়ামী লীগের টিকেট পেয়ে ঢাকাই সিনেমার এই নায়ক সংসদ সদস্য বনে যান। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরের পর সরকারের অনেক মন্ত্রী, এমপিরাও দেশ ছাড়েন। এরপরই প্রশ্ন উঠে ফেরদৌস কোথায় আছেন?

জানা যায়, ৪ আগস্ট রাত পর্যন্ত ঢাকাতেই অবস্থান করছিলেন ফেরদৌস। এর দুদিন আগেও বিটিভিতে হাজির হয়ে টেলিভিশন চ্যানেলটির ওপর হামলা নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। তবে ৫ আগস্ট থেকে ফেরদৌসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই নায়কের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও ৪ আগস্টের পর কোনো স্ট্যাটাস শেয়ার করতে দেখা যায়নি। তার নিকটজনরা বলছেন, পরিবার নিয়ে ফেরদৌস দেশ ছেড়েছেন। যদিও এই খবরের এখনও কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

আত্মগোপনে রয়েছেন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ। সরকার পতনের পর মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক এ সংসদ সদস্যের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি কী দেশেই আছেন, নাকি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন সেই খবরও পাওয়া যায়নি। ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে একটি গানের ভিডিও নিয়ে হাজির হন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম। ভিডিওটি মমতাজ কোথায় ধারণ করেছেন সে বিষয়ে কিছু জানাননি। তবে কোনো একটি রুমের বিছানায় বসে ‘আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে? আমার চোখ বান্ধিবি, মুখ বান্ধিবি, পরাণ বান্ধিবি কেমনে?’ শিরোনামের গানটি পরিবেশন করতে দেখা গেছে তাকে।

গণআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট দেশে ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। তিন দিন পর গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর একে একে গ্রেফতার হতে থাকেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্যরা। সেলুলয়েডের বাকের ভাই আসাদুজ্জামান নূর ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-২ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। পরে জেতেন আরও চারটি নির্বাচনে। দশম সংসদ নির্বাচনের পর সংস্কৃতিমন্ত্রী হন তিনি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার বেইলি রোডে নওরতন কলোনির বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আলমগীর কুমকুম মারা গেলে সংগঠনের দুই নেতা তারানা হালিম ও প্রয়াত আকবর হোসেন পাঠান ফারুকের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই দ্বন্দ্ব চলে দীর্ঘদিন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিকবার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হয়েছেন তারানা হালিম। দ্বাদশ সংসদের এই সংরক্ষিত নারী এমপি কোথায় আছেন কেউ তা জানেন না।

ছোট পর্দার অভিনেত্রী শমী কায়সার কারাগারে আছেন। জুলাই বিপ্লবে বেশ কয়েকজন ছাত্র-জনতা আহত হলে তারা শমী কায়সারের নামে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। সেই মামলার আসামি হিসেবেই রাজধানীর উত্তরা থেকে এই অভিনেত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। ছোট পর্দায় অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করা শমী কায়সার রাজনীতির মাঠে সরব ছিলেন। রাজনৈতিক প্রভাব ও আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) পরিচালক নির্বাচিত হন। এফসিসিআইয়ের পরিচালক পদে বসেই যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান এই অভিনেত্রী। ই-কর্মাস প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ই-ক্যাবের সভাপতিও ছিলেন শমী। যদিও ১৪ আগস্ট এই পদ থেকে পদত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান।

ফেরদৌস গা ঢাকা দিলেও চিত্রনায়ক রিয়াজকে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়। ৬ আগস্ট রাতে তিনি ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গেলে তাকে ফেরত পাঠায় ইমিগ্রেশন পুলিশ। রিয়াজ বিগত সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরব ছিলেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের কাছে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে ২০১৫ সালে রিয়াজ তার রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেন। চঞ্চল চৌধুরী, নাদের চৌধুরী, তুষার খান, জাহিদ হাসান, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারানা হালিমও ছিলেন সেখানে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রচারের সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন শাকিল খান, অরুণা বিশ্বাস, সাদিয়া ইসলাম মৌ।

জুলাই বিপ্লবে বিটিভিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানান দেন সুজাতা, ফেরদৌস, রিয়াজ, অরুণা বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, শমী কায়সার, আজিজুল হাকিম, রোকেয়া প্রাচী, সুইটি, হৃদি হক, জ্যোতিকা জ্যোতি, সাজু খাদেম, সোহানা সাবা, চন্দন রেজা, সংগীতশিল্পী শুভ্র দেব, পরিচালক মুশফিকুর রহমান গুলজার, এসএ হক অলিক, খোরশেদ আলম খসরু প্রমুখ।

মেহের আফরোজ শাওন দেশে আছেন। শুরু থেকে ফেসবুকে অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে সমালোচনা করছেন তিনি। গত ২৮ আগস্ট তিনি তার একটি ছবি পোস্ট দিয়ে নিজেই জানিয়েছিলেন, নেপালের নাগরকোট আছেন। আবার দেশে ফিরে নানা ছবি পোস্ট করছেন। সোহানা সাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব। তার ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘সবুজিয়া পাখি’ শিরোনামে শাড়ি পরা ১০টি ছবি পোস্ট করেন। জানা গেছে, তিনি এখন তুরস্কের ইস্তানবুল আছেন।

২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি প্লট চেয়ে আবেদন করেছিলেন বিতর্কিত উপস্থাপক এবং অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয়। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করে হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় আসামি করা হয়েছে তাকে। এসব ঘটনার পর নতুন করে ভাইরাল হয় প্লট চেয়ে শেখ হাসিনার কাছে করা তার ১০ বছর আগের আবেদন। ওই আবেদনে দেখা যায়, শেখ হাসিনাকে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ নেত্রী ও আদর্শ মা সম্বোধন করেছেন জয়।

শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘মুজিব একটি জাতির রূপকার’ সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে গত বছর পূর্বাচলে ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ পান নায়ক আরিফিন শুভ। একই এলাকায় তিন কাঠার একটি প্লট দেওয়া হয় সিনেমাটির প্রযোজককেও। তবে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সম্প্রতি এই প্লট দুটির বরাদ্দ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজউক।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কিনে আলোচনায় আসেন নায়িকা মৌসুমী। সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কেনার পর থেকেই চারদিকে নানা আলোচনা শুরু হয়। ওইসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণদের রাজনীতিতে আসার আহ্বান করেছেন। তিনি তারুণ্যনির্ভর একটি মন্ত্রিসভাও করেছেন। এগুলো দেখেই আমি রাজনীতিতে আসার সাহস পেয়েছি। তার নিকটজন থেকে জানা গেছে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছিলেন তারকারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন মাহিয়া মাহি। এ নিয়ে তখন গণমাধ্যমে মাহিয়া মাহি বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করতে চাই। একই সঙ্গে আমার জন্মস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। তাই নির্বাচন করতে চাইছি। মনোনয়নপত্র কিনেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছেলে প্রযোজক আরশাদ আদনান। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় কয়েকবারই মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান। আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি। বরিশাল-৩ আসনের মনোনয়ন কিনেন চিত্রনায়ক রুবেল।

এ প্রসঙ্গে তিনি তখন বলেছিলেন, আমরা পারিবারিকভাবে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ কারণে অন্য কোনো দল বা আদর্শের কথা কখনো মাথায় আসে না। আর আমার জন্ম বরিশালের বাবুগঞ্জে। তাই বরিশাল-৩ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছি।

বাগেরহাট-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন চিত্রনায়ক শাকিল খান। জুলাই বিপ্লবে পতিত সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হতে চেয়েছিলেন রোকেয়া প্রাচী, চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস, নিপুণ, তানভিন সুইটি, সোহানা সাবা, শাহনূর ও ঊর্মিলা শ্রাবন্তী করও।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর