কবে শেষ হবে সাংবাদিক তুরাব হত্যা মামলার তদন্ত?
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৬:৩৫ AM

পেশাগত দায়িত্বপালনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়ার ৫ মাস

কবে শেষ হবে সাংবাদিক তুরাব হত্যা মামলার তদন্ত?

আহমেদ পাবেল

প্রকাশিত: ১৯/১২/২০২৪ ১০:৫০:১৪ AM

 কবে শেষ হবে সাংবাদিক তুরাব হত্যা মামলার তদন্ত?


সিলেটে ছাত্রজনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে প্রকাশ্য দিবালোকে দায়িত্বপালনরত অবস্থায় পুলিশের গুলিতে নির্মম ভাবে নিহত দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান এটিএম তুরাম হত্যাকাণ্ডের ৫ মাস অতিবাহিত হলেও মামলার তদন্ত কাজের কোন অগ্রগতি নেই। এ মামলার একজন এজহারভূক্ত আসামীকে গ্রেফতাররের পর রিমান্ডে নিলেও এর কোন আপডেট তথ্য নেই নিহতের পরিবারের কাছে। আর মামলার প্রভাবশালী একজন পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতার হলেও অন্যান্য কর্মকর্তারা এবং আওয়ামীলীগের নেতারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও রহস্যজনক কারনে তাদেরকে গ্রেফতার বা চাকুরিচ্যুৎ করা হচ্ছে না। ফলে মামলার তদন্ত নিয়ে সন্ধিহান রয়েছে নিহতের পরিবার, এমনকি তার ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। আর এমনি পরিস্থিতিতিতে চরম হতাশায় রয়েছে নিহত তুরাবের পরিবার। তারা ইতিমধ্যে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন।

জানা যায়, বিগত ১৯ জুলাই বাদ জুম্মা সিলেট নগরের কোর্টপয়েন্টে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলের ছবি তোলার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান এটিএম তুরাব। তুরাব সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার পৌরশহরের ফতেহপুর গ্রামের মাস্টার আব্দুর রহিমের কনিষ্ট পুত্র। তিনভাই এক বোনের মধ্যে তুরাব ছিলেন সবার ছোট। সিলেট নগরের যতরপুরে মা আর ভাইদের সঙ্গে তিনি বাস করতেন। মাত্র আড়াই মাস আগে বিয়ে করেছিলেন তিনি। মেহেদীর রঙ মোছার আগেই বিধবা হয়ে যান তাঁর যুক্তরাজ্য প্রবাসী সহধর্মিনী। সাংবাদিকতা জীবনের প্রায় ১৫ বছরে জাতীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার, ব্রাক মাইগ্রেশন অ্যাওয়ার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন ছিলো তাঁর। সিলেট প্রেসক্লাব, বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এটিএম তুরাব। গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজার সংবাদ, সপ্তাহজুড়ে’সহ একাধিক গণমাধ্যমে তিনি কাজ করেছেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে গত ১৯ জুলাই দুপুরে নগরের বন্দরবাজার এলাকা থেকে মিছিল বের করে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠন। সেখানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বেঁধে যায় মিছিলকারীদের। পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছোঁড়ে। ওইদিন আরও কয়েকজন সহকর্মীর সাথে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তুরাব। আর সেখানেই গুলিবিদ্ধ হন তিনি। সংঘর্ষ শুরুর কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত সহকর্মীরা দেখেন তুরাব মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। তৎক্ষণাৎ তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান সহকর্মীরা। পরে সেখান থেকে তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থান তুরাব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন ২০ জুলাই ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তুরাবের মরদেহের ময়না তদন্ত হয়। সেদিন বিকেলে গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

ঘটনার পর দিন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান শামসুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান ‘নিহতের শরীরে ৯৮টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায় ঢিলের আঘাতও ছিল। এ কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

এদিকে, এ ঘটনার পর সিলেটের সাংবাদিক সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সিলেট প্রেসক্লাব, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব, ফটো জার্নালিষ্ট এ্যাসোসিয়েশন সহ সিলেটের সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বশীল ৭টি সংগঠন যৌথভাবে প্রতিবাদ করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রæত গ্রেপ্তার এবং শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানায়। এরপর বিভিন্ন সময়ে পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকরা।

ঘটনার পরপরই কোতায়ালি থানা পুলিশ বাদী হয়ে ৩৪ জনকে আসামি করে কোতায়ালি থানায় একটি মামলা করেন। এতে পুলিশের কাউকে আসামির তালিকায় রাখা হয়নি। বেশিরভাগ বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়। এতে ক্ষুব্দ হয় নিহতের পরিবার। ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিলেটের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দরা। ফলে ঘটনার এক মাস পর ১৯ আগস্ট নিহতের ভাই আবুল হাসান মো. আযরফ (জাবুর) বাদী হয়ে সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালছাড়াও এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো. সাদেক দস্তগির কাউসার, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ, হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়তি আওয়ামীলীগের নেতারা সহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। সেই সঙ্গে অজ্ঞাতনামাও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

মামলা দায়েরের পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভোররাতে মামলার ৬নং আসামি- ঘটনার সময়কার সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মঈন উদ্দিন শিপনকে তার বাড়ি থেকে বিজিবি আটক করে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ অবস্থায় মামলাটির তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন আদালত। ফলে ৮ অক্টোবর কোতায়ালি থানা পুলিশ মামলার নথিপত্র পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করে। পরদিন ৯ অক্টোবর মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মোহম্মদ মুরসালিনের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেখানে সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত থেকে তাদেরকে সহযোগিতা করেন। কিন্তু এরপর আর এ মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই জানা যাচ্ছে না।

এর পর গত ১৭ নভেম্বর ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় মামলার এজহারভূক্ত আসামী পুলিশ সদস্য উজ্জ্বল সিনহাকে। তাকে রিমান্ডে নেয় পিবিআই। কিন্তু রিমাণ্ডের তিনি কি তথ্য দিয়েছে তা এখনো অজানা।

এদিকে, পুলিশ সদস্য উজ্জলকে গ্রেফতার করা হলেও এখনো বহাল তবিয়তে চাকুরী করছেন পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত) আজবাহার আলী শেখ, সহ মামলার অভিযুক্ত পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তারা। রহস্যজনত কারনে তাদেরকে গ্রেফতার ও চাকুরীচ্যুৎ করা হচ্ছে। ফলে নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজে বিষয়টি নিয়ে দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে।

সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যা মামলার বাদী ও তার বড় ভাই আবুল হাসান মোহাম্মদ আযরফ (জাবুর) আজকের সিলেটকে বলেন, আমরা খুবই হতাশ। একটি ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটলো। মামলার এতদিন পরও কোনো অগ্রগতি নেই। খুনিরা এখনও বহাল তবিয়তে। তাদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তও নেয়নি প্রশাসন। আমি আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার পাবো কী না তা নিয়ে সংশয়ে আছি।

তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে পিবিআইর পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুরছালিন কোন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে চাননা, বিষয়টি খুবই রহস্য জনক। গতকালও বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তদন্ত কর্মকর্তা মুরছালিনকে কল দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কারো কল রিসিভ করেন নি, বরং সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন।

তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে পিবিআইর পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুরছালিনের মোবাইল ফোনে গতকাল দিনভর অসংখ্যবার কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

পিবিআই, সিলেটের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ-উজ-জামান আজকের সিলেটকে বলেন, মামলাটির তদন্তে বিলম্ব হবে। একজন আসামীকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে আনা হয়েছিল, তার কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, তবে তা প্রকাশ করা যাবে না।

এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামীরা এখনো পুলিশের চাকুরীতে বহাল রয়েছেন, তাদেরকে গ্রেফতারের কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তে তাদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত জড়িত থাকার কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। তাদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলেই কেবল গ্রেফতার করা হবে।

আজকের সিলেট/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর