হাকালুকিতে মাছের আকাল
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০৩:২৪ PM

হাকালুকিতে মাছের আকাল

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৫/০২/২০২৪ ০৯:০৮:৩৯ AM

হাকালুকিতে মাছের আকাল


বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওরের নাম হাকালুকি। যেটি স্থানীয়দের কাছে মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন এখান থেকে অসংখ্য মানুষ মাছ ধরে নির্বাহ করেন তাদের জীবন জীবিকা। এখানেই জড়িয়ে আছে তাদের আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ।

সুস্বাদু মাছ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত এ হাওরটিতে এরই মধ্যে বিল ভরাট, কারেন্ট জালে মাছ ধরা, বিল সেচ করা, অভয়াশ্রম সংকট, নিয়ম বহির্ভূত ইজারা, জনবল সংকট এবং আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকা। এমন নানাবিধ সংকট, তদারকি ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে হাওরের মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা।

স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এ হাওরের জলজ জীববৈচিত্র্য রয়েছে হুমকির মুখে, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, নেই জলজ বন। ধ্বংস করা হচ্ছে মাছের আবাসস্থল। ফলে ধারাবাহিক ভাবে কমছে মাছের উৎপাদন।

জানা যায়, হাকালুকি হাওরের ছোটবড় ২শত ৩৮ টি বিল থাকলেও বর্তমানে দৃশ্যমান রয়েছে প্রায় ২শত টি। বাকিগুলো ভরাট হয়েছে অথবা অন্য বিলের সাথে মিশেছে। ১৮ হাজার ১শত ১৫ হেক্টর আয়তনের হাকালুকি হাওরের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে বরং ধ্বংস করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

জানা গেছে, বৃহত্তম এই হাওর দীর্ঘদিন ধরেই অরক্ষিত। নানা কারণেই হুমকির মুখে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এবং সরকার ঘোষিত মৎস্য অভয়াশ্রম। হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ছয়টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত। এরমধ্যে মৌলভীবাজার জেলা অংশে ৭০ শতাংশ ও বাকি ৩০ শতাংশ পড়েছে সিলেট জেলায়।

জেলা মৎস্য সুত্রে জানা যায়, এবার পুরো জেলায় মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৫৫ হাজার ১শত ৫৫ মেট্রিক টন হলেও ঘাটতি থাকবে ৬ হাজার মেট্রিক টন।

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার চাতলাবিল ঘুরে দেখা যায়, জেলেরা দল বেঁধে মাছ ধরছেন। নৌকা করে সেই মাছ ঘাটে আনা হচ্ছে। ঘাটেই অস্থায়ী নিলাম কেন্দ্রে মাছ বিক্রি হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পাইকারি ব্যবসায়ীরা সেই নিলামে হাঁকডাক দিয়ে মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

মৎস ব্যবসায়ীরা জানান, হাকালুকির মিঠাপানির তাজা ও সুস্বাদু মাছের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। তবে ঢাকা সিলেটের বড় ব্যবসায়ীরা এখান থেকে বেশি দাম দিয়ে মাছ কিনে নেয়ায় আশপাশের ছোট ব্যবসায়ীরা সুযোগ পান না। আবার এ বছর মাছও পাওয়া যাচ্ছে কম। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখছেন না।

জেলেরা জানান, একসময় বড় বড় রুই, বোয়াল, আইড়, মৃগেল ও কার্প এবং শোল জাতীয় মাছ বেশি পাওয়া গেলেও এবছর তা নেই বললেই চলে। যা আছে তা পরিমাণে খুবই কম এবং আকারে ছোট।

জেলে মুখুন্দ্র নমশূদ্র বলেন, বড় মাছের ন্যায় দেশী জাতের ছোট মাছ এবার ধরা পড়ছে কম। ফলে রোজগার তেমন হচ্ছে না।

মৎস্য ব্যবসায়ী ফকরুল ইসলাম বলেন, এই হাওরের মাছের চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দামে বিক্রি করে সবসময় লাভবান হন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। কিন্ত এবছর মাছের সংকট থাকায়, তাদের মাথায় হাত। ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

বিল ইজারাদার হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, নানান কারণে হাওর হারাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাচ্ছেনা। অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ ও বিলগুলো ভরাট হচ্ছে দিনেদিনে। যদি হাওরকে সঠিকভাবে রক্ষা করা যেতো তাহলে মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ হতো।

বিগত কয়েকবছর ধরে মাছের উৎপাদন কমছে ধারাবাহিকভাবে, এ অবস্থায় বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, প্রতিবছর বেশি লাভের আশায় অনেক বিল শুকিয়ে মাছ ধরেন ইজারাদার। যা বিল লিজ নীতিমালার পরিপন্থী। অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার ফলে হাওর তার প্রতিবেশগত গুরুত্ব হারাচ্ছে। নীতিমালা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

মৌলভীবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শাহনেওয়াজ সিরাজী বলেন, নানাবিধ সংকটের মধ্যে চলতে হচ্ছে আমাদের। অবাধে আইন ভঙ্গ করে মাছ ধরা ও হাওরকে ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। জনবল কম থাকায় আমরা কিছু করতে পারছি না।

আজকের সিলেট/ডিএম/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর