জকিগঞ্জে আইনের তোয়াক্কা না করে চলছে প্রকাশ্যে ধুমপান ও তামাক পণ্যের নজরকাড়া রমরমা বিজ্ঞাপন। সিগারেট কোম্পানিগুলোর রঙছটা বিজ্ঞাপনে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনবিরোধী। এ ধরনের কার্যক্রমে প্রতিনিয়িত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে উপজেলাবাসী। এরপরও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন।
জকিগঞ্জের গণপরিবহন ও পাবলিক প্লেসে প্রকাশ্যে ধুমপানের কারনে অসুবিধায় রযেছে শিশু, বয়স্ক ও সাধারণ রোগীরা। তাছাড়া জকিগঞ্জের চা স্টল ও পানের অধিকাংশ দোকানে টোব্যাকো কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। অথচ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, এসব বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর আইন লঙ্ঘন করে প্রকাশ্যে ধূমপান তে চলছেই। প্রতিবাদ করলে উল্টো ধুমপায়ী ও গাড়ীর ড্রাইভারদের রোষানলে পড়তে হয়।
প্রকাশ্যে ধুমপান যে একটা অপরাধ, তা ভুলে যেতে বসেছে ধুমপায়ীরা। দোকানগুলোতে সিগারেট পণ্যের নজরকাড়া বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অতচ এ বেআইনী কাজ থেকে বিরত রাখতে দৃশ্যত কোনো আইনী পদক্ষেপ নেই বললে চলে।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ সংশোধন) আইন, ২০০৫ সংশোধিত (২০১৩)-এর ধারায় বলা আছে, বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্যের প্যাকেট বা মোড়ক সাদৃশ্য কোনও দ্রব্য, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ছাপানো কাগজ, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড বা অন্য কোনোভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা যাবে না।
তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনও উপহার, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান আইনত দণ্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনের এই ধারা অমান্যকারীকে তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের দোকান নিষিদ্ধ। সেইসঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি অপরাধ।
পাবলিক প্লেস ও গনপরিবহন সহ সংশ্লিষ্ট স্থানে ধুমপান করা ও বিজ্ঞাপন প্রচার করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। আইন অমান্য করলে অর্থদন্ডসহ জেল দেওয়ার বিধান আছে।
অতচ আইন অমান্য করে জকিগঞ্জে পাবলিক প্লেসে চলছে ধুমপান ও তামাকজাত পণ্যের প্রচারণা। জকিগঞ্জের এমএ হক চত্ত্বর, বাসস্ট্যান্ড এলাকাসহ বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে চলছে প্রকাশ্যে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের প্রচারণা। এসব তামাকজাত পণ্যের দোকান গুলোতে, সংশ্লিষ্ট তামাকজাত পণ্যের কোম্পানীর পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনের স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব স্টলে চলছে প্রকাশ্যে ধুমপান। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরবতায় বাড়ছে এসব কর্মকান্ড।
তামাকপণ্য বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানীরগুলোর পক্ষ থেকে এসব পোস্টার, ছোট আকারে স্টিকার দোকানের সামনে লাগিয়ে দিয়ে যায়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজদারীর অভাবে জকিগঞ্জে প্রকাশ্যে ধুমপান ও তামাকজাত পণ্যের প্রচারণা চলছে বলে অভিযোগ করেন অনেকেই।
বৃহস্পতিবার উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে ধুমপান করা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, প্রকাশ্যে ধুমপান করা অপরাধ। তারপরেও টেনশনে থাকায় তিনি ধুমপান করছেন , আর কখনো প্রকাশ্যে ধুমপান করবেন না বলে জানান তিনি।
জকিগঞ্জ বাজারের এক রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ী বলেন, ‘তামাক কোম্পানিগুলোর প্রচারণায় রেস্টুরেন্টগুলো ধূমপানের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে রেস্টুরেন্টগুলোতে আসেন অনেকে, অথচ ধূমপানের কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। কেউ প্রতিবাদও করে না।’
বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের সদস্য ও সিলেট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি'র (এসডিএস) নির্বাহী পরিচালক মোঃ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো। ক্রেতা-বিক্রেতাদের বিভিন্ন উপহার দেওয়া হচ্ছে। সিগারেট সরবরাহের যানবাহনে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করছে। এসব প্রচারণায় অনেকে ধূমপানে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আইনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও শিশু-কিশোরদের কাছে অবাধে সিগারেট বিক্রি করছে। আইনবহির্ভূত এসব কার্যক্রমের মূলে রয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ও জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (জেটিআই)। আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি তারা আইনের বিরোধিতা করছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানোর অনুরোধ জানিয়েছে তামাকবিরোধী জোট ও এসডিএস।’
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে জানা যায, তামাক মুক্ত সিলেট বিভাগ গড়তে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের উপর প্রতিমাসে কমপক্ষে দুইটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও টাস্কফোর্স কমিটির সভা করার কথা থাকলেও বহুমাস থেকে জকিগঞ্জে কোনো সভা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়নি।
উপজেলা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: এস এম আব্দুল আহাদ বলেন, কয়েকমাস যাবৎ আমাদের কমিটির কোনো মিটিং করতে পারি নাই বাজেটের অভাবে। তবে গত মাসে অভিযান পরিচালনার কথা ছিল। আমরা শুধু জনগণকে সচেতনতা মূলক প্রচার, প্রচারণা চালাই। আইন বাস্তবায়ন করে মাঠ প্রসাশন।
তিনি বলেন, ধুমপানের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে অনেকেই। এতে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই আইনটি মেনে চলা জরুরী বলে মনে করি।
জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফসানা তাসলিম বলেন, প্রকাশ্যে ধুমপান করা ও তামাক কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন প্রচার আইনের লঙ্ঘন। এ বিষয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। সবাইকে আইন মান্য করার আহবান জানাচ্ছি।
আজকের সিলেট/প্রতিনিধি/এসটি
জকিগঞ্জ প্রতিনিধি 








