সুনামগঞ্জের হাওরের বিল—বাদাড়ে প্রতিনিয়তই অসাধু পাখি শিকারী চক্র অবাধে পাখি শিকার করে চলেছে। একশ্রেণির দুষ্ট লোক সুতার তৈরি ফাঁদ, বন্দুকের গুলি কিংবা বিষটোপ দিয়ে অতিথি পাখি দেদারছে ধরে লুকিয়ে তা বিক্রি করছে। ফলে হাওরে অতিথি পাখির সংখ্যা দিন দিন কমছে। অসাধু চক্রের হীন কর্মকাণ্ডে হাওরের প্রাণ—প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য এভাবে ধ্বংস হলেও দায়িত্বশীল কতৃর্পক্ষ অনেকটা নির্বিকার বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাওরাঞ্চলের এক শ্রেণির মানুষ সর্বদাই পাখি শিকার করে বেড়ায়। শীত মৌসুম এলে তারা শিকারের মাত্রাটা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ এ সময় শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে শতাধিক প্রজাতির পাখি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হাওর এলাকায় অবস্থান করে। এ সুযোগে ধূর্ত শিকারী চক্র বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে পাখি শিকার করে চড়া দামে তা বিক্রি করে। আইনী ধরপাকড়ের ঝামেলা এড়াতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের রসনাবিলাসের জন্য পাখি সরবরাহ করা হয়। শিকারী চক্রের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আছে।
শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে সুদূর সাইবেরিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে লেনজা হাঁস, পিংহাঁস, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, তাইম, জলপিপি, বেগুনি কালেম, রাজসরালি, লালবুবা, গঙ্গা কবুতর, কালাকোড়া, ডাহুক, পিয়ারী, মৌলবী, গাঙচিল, সারস, মাথায় টোপ, পাতিকুট, দুবড়া খাউড়ি, বৌড়াল, রানের কৌড়া, বৈদড়, আমডাক, ওডা, পদ্মাকৌড়ি, হরিয়াল, শঙ্খচিল, শামুককনা, জলকুক্কুট, চখপখিম সারস, কাইমা, ফরালিসহ নানা প্রজাতির পাখি দল বেঁধে হাওরে বিচরণ করে। এতে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্যতা বজায় থাকলেও কতৃর্পক্ষের উদাসীনতা এবং মানুষের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রাণ যাচ্ছে অতিথির পাখির।
শীত কমতে শুরু হয়েছে। এখনো কিছু পাখি আছে হাওরে। গেল সপ্তাহে শনির হাওরের লালুর গোয়ালা এলাকায় গিয়ে দেখা হয় পাখি শিকারী রাধানগর গ্রামের জসীম উদ্দিনের সঙ্গে। জবাই করা পাখি জসীম উদ্দিনের হাতে দেখে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এই পাখি কতলায় (কতজনে) কতভাবে মারে। কেউ পাইক্কা দিয়া পাইক্কা শিকার করে। কেউ বিষটোব দিয়া মারে। পরে জবো কইরা বেইচ্যালায় (বিক্রি করে)। খাউকিরায় (যারা পাখি খায়) আইয়া নেয় গা। বেশি হইলে কেউ বাজারে নিয়াও বেচে।’
পাখি কিভাবে মারা হয় প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘পাখি মারার ফান আছে, ফান। বড়ির হুতা (সুতা) আছে না, এইতা দিয়া বানা নি হয়। এইডারে কয় তৌল্যা ফান। এই ফান দিয়া দৈনিক দুইডা—চাইড্যা মারণ যায়। এইতা এক হাজার টেকা গোডা (প্রতিটা)। বাড়িত থাইক্যা (থেকে) নেইগ্গায় (নিয়ে যায়)।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেহেলী ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের একজন বলেন, পৌষ—মাঘ মাসও পাখি বেশি মারণ যায়। শীত কইম্যা যাওয়ায় এখন একটু কম। তারপরও দুই—একটা কইরা ধরন যায়। পৈন্ডুব বাজারে নিয়া একেকটা হাজার ১২শ’ টাকায় বিক্রি হয়। পাখি মারা যদিও নিষিদ্ধ, তারপরও লুকাইয়া—চাপাইয়া সবাই মারে। পাখির সৃজনে শুধু স্থানীয়রা না, বাইরের মানুষ আইয়া মারে। এইখানে আইয়া কেডায় খবর লয়। যে যেভাবে পারে এইভাবেই পাখি মারতাছে।
প্রকৃতির আধারখ্যাত অতিথি পাখির প্রাণ কেড়ে নিয়ে মানুষ রসনাবিলাসে মত্ত হয়ে পড়েছে। পাখি শিকার ও হত্যার অপরাধে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর ৩৮(১) ধারা অনুযায়ী, পাখি শিকার ও হত্যা করলে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড হতে পারে। এর পুনরাবৃত্তি হলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড হতে পারে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ না থাকায় পাখি শিকারীরা বেপরোয়া হচ্ছে। যার খেসারত পড়ছে জীববৈচিত্র্যে।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আব্দুল করিম কিম বলেন, হাওরের অতিথি পাখি সংরক্ষণের দায়িত্ব বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের। কিন্তু শীতকালে শিকারীরা হাওরে অবাধে পাখি শিকার করলেও কোন ধরনের অভিযান হয় না। যা হয় তাও লোকদেখানো। মূলত হাওরে বন্যপ্রাণী রক্ষা করার কথা যাদের, তারা অনেকেই পরিযায়ী পাখি ভক্ষনের লোভ সামলাতে পারে না। তাদের আশ্রয়—প্রশ্রয়ের কারণে শিকারীরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, অতিথি পাখিসহ বন্যপ্রাণী শিকার আইনত নিষিদ্ধ। হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে এরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাখি নিধন করে বাস্তুসংস্থানের চরম ক্ষতি করা হচ্ছে। হাওরের বাস্তুসংস্থান বিনষ্টকারীরা আইনত অপরাধী। এ জন্য প্রশাসন দায়বদ্ধ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জেলা জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা মাহমুদুল হক খান বলেন, আমাদের লোকবল কম। এরপরও কোথাও পাখিসহ জীববৈচিত্র আটক হবার খবর পেলে আমরা সেখানে পেঁৗছে উদ্ধার করে উর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে উন্মুক্ত করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন জায়গায় প্রাণবৈচিত্র সংরক্ষণে সচেতনতামূলক সভাও করে থাকি আমরা। বৃহস্পতিবারও তাহিরপুরের একটি এলাকায় সচেতনতামূলক সভা হয়েছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








