এক সময় গ্রামবাংলার এক অপরুপ সৌন্দর্য ও চোখ জোড়ানো চিরচেনা রূপ বোঝানো হত বা বর্তমানেও বিভিন্ন পাঠ্যবই কিংবা নাটক ছবিতে দেখানো হয় কুঁড়েঘর বা ছনের ঘর। এক সময় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব ঘর দেখতেও অপরুপ সৌন্দর্য ছিল, তেমনি প্রচণ্ড শীত বা গ্রীষ্মের দাবদাহে বেশ আরামের ছিল ছনের ঘর বা কুঁড়েঘর যা বর্তমান আধুনিকতার যুগে হারিয়ে গিয়েছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় আর আধুনিকতার সাথে সাথে মানুষের জীবনমানে সবকিছু বদলে গিয়েছে। ডিজিটাল আর আধুনিকতায় একে একে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য কুঁড়েঘর বা ছনের ঘর । 'ইট পাথর, টিন, আধাপাকা ঘরের স্থায়িত্বের কাছে সময়ের পরিবর্তনে বিলুপ্তের পথ বাঙ্গালীর এক সময়ের এসব কুঁড়েঘর'।
"কয়েক দশক আগে সিলেট জেলার বিভিন্ন গ্রামে অথবা চা বাগানের ভিতরে ডুকলেই এসব কুঁড়েঘর বা ছনের ঘর দেখা যেত। সে সময় পাহাড় থেকে ছন কেটে শুকিয়ে তা বিক্রির জন্য আঁটি বেঁধে হাটে নিয়ে যাওয়া হতো অথবা ধান কাঁটার পর কেড় দিয়েও কোন কোন জায়গায় ছনের ঘর বা কুঁড়েঘর তৈরী করা হত যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না । কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না শহর বা গ্রামের কোথাও"।
সাবেক সেনা সদস্য নূরুল হক জানান, এক সময় ছন দিয়ে রান্না ঘর করা হত। আমরা আনন্দের সাথে এসব রান্নাঘর তৈরী করতাম। কিন্তু বর্তমানে কম দামে টিন পাওয়ায় মানুষ এখন আর ছন দিয়ে এসব ঘর বানাতে চায় না। আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরেছি যেখানে আগে এক সময় দেখা যেত ছনের ঘর। কিন্তু বর্তমানে এগুলো আর দেখা যায় না। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন গ্রামে আগে ছিল ছনের ঘর যা এখন আমরা দেখতে পাই না। পাকা ঘর নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। গ্রামের গরিব-মধ্যবিত্তের ঘরের ছাউনির একমাত্র অবলম্বন ছিল এই ছন।
আর এখন মানুষপাকা-আধাপাকা বাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত। ছন ও বাঁশ না পাওয়ায় ছনের ব্যবহার ক্রমেই বিলুপ্তির পথে। যা শুধু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বই কিংবা ছবিতে দেখতে পাবে বাস্তবে না। আমরা ধীরে ধীরে আধুনিক আর ডিজিটালে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য গুলো হারিয়ে ফেলছি।
চা বাগানের একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধ মিন্টু দাশের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগের মতো পাহাড় নেই, পাহাড়গুলা কেটে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা, মানছে না কোনো আইন। আগে যেসব পাহাড়ে ছন হতো সেসবে এখন অন্য চাষাবাদ হচ্ছে। আগে প্রতি বছর পুরনো ছাউনি সরিয়ে নতুন করে ছন লাগানো হতো। অবশ্য এখনো কেউ কেউ অর্থাভাবে, আবার কেউ আরামের জন্য ছনকে ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করেন। গ্রামে ছনের ছাউনির ঘর তৈরির বেশ কিছু কারিগর ছিলেন, যাদের বলা হতো ঘরামি। তাদের দৈনিক মজুরি ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। ছনের পাতলা অংশ কেটে সাজিয়ে কয়েকটি ধাপে ছাউনি বাঁধা হতো'।
বাংলাদেশের হাট বাজার গুলোতে এক সময় ছনের ছাউনি দিয়ে ছোট ছোট ঘর বানিয়ে তার নিচে বাজার বসত। কালের বিবর্তনে হাট-বাজারগুলোতে এখন ছনের ঘর নাই বললেই চলে।
আজকের সিলেট/এফএম/কেআর
মো: ফারুক মিয়া 








