কাটছেনা গ্যাস সংকট, বিপাকে পাম্প মালিক ও পরিবহন শ্রমিকরা
শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৩:৫৩ AM

সিলেটের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে মাস শেষের আগেই লোড শেষ

কাটছেনা গ্যাস সংকট, বিপাকে পাম্প মালিক ও পরিবহন শ্রমিকরা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫/০২/২০২৪ ০২:১৫:৪৫ AM

কাটছেনা গ্যাস সংকট, বিপাকে পাম্প মালিক ও পরিবহন শ্রমিকরা


মাস শেষ হওয়ার আগে লোড শেষ, এটি সিলেটের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর প্রতি মাসের চিত্র। ফলে মাসের শেষের দিকে এক সপ্তাহের বেশী সময় সিলেটের অধিকাংশ সিএনজি পাম্প বন্ধ থাকা এখন নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার। এসময় যে কয়েকটা পাম্প চালু থাকে সেগুলাতে তৈরী হয় যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। গ্যাস নিতে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয় চালক ও গ্রাহকদের।

গত কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি চালাচালিতেও হয়নি সমাধান। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানের দাবীতে কঠোর আন্দোলনের পথে হাঁটছেন সিলেটের পাম্প মালিকগণ। তাদের সাথে এবার আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন পরিবহন মালিক শ্রমিকদের সংগঠনও। ইতোমধ্যে পৃথকভাবে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধান না হলে ধর্মঘটসহ কঠোর কর্মসূচী দেয়ার হুশিয়ারী দিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের সংকট কোনভাবেই কাটছেনা। মাস শেষ হওয়ার আগে গ্যাসের লোড শেষ হয়ে যাওয়ায় পাম্প বন্ধজনিত কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিক-চালক ও যাত্রীরা। তাই এবার পাম্প মালিকদের সংগঠন সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার এসোসিয়েশনের সাথে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন পরিবহন শ্রমিকদের ৬টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সিলেট জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

সিএনজি স্টেশন মালিক ও পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের বৃহৎ গ্যাস সিলেট থেকে আহরণ করা হয় অথচ সিলেটবাসীকে সেই গ্যাস থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সসহ যাবতীয় যানবাহনে জ্বালানি সঙ্কট চরম আকারে পৌঁছেছে। ২০০৭ সালের বেধে দেয়া লোড দিয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলছে। এই দীর্ঘ ১৭ বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, সড়ক প্রস্থ হয়েছে, সড়কে যানবাহন কয়েকগুণ বেড়েছে কিন্তু গ্যাস স্টেশনের লোড বাড়ানো হয়নি। স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে জ্বালানি না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। বিষয়টি সিলেট জালালাবাদ গ্যাস অফিসকে বারবার জানানোর পরও তারা সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছেন না।

তারা বলেন, আমাদের আন্দোলন করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নাই। গ্যাস স্টেশনে লোড বাড়ানো না হলে চলমান সঙ্কট দূর করা সম্ভব নয়। ফিলিং স্টেশনে চাহিদা মত গ্যাস সরবরাহ করা না হলে সিলেট বিভাগের সকল সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হবে, পরিবহন শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করবে ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করাসহ কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

এদিকে, সিলেটের সিএনজি ফিলিং স্টেশনের লোড বাড়ানোর দাবিতে সিলেট জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার এসোসিয়েশন সিলেট বিভাগের নেতৃবৃন্দ।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়- সিলেট বিভাগের তীব্র জ্বালানি (সিএনজি) সংকট নিয়ে চলমান অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগের জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সংগঠন হিসেবে বিদ্যমান অচলাবস্থা নিরূপণের নিমিত্তে সময়োপযোগী, জনবান্ধব ও কাঙ্খিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানান। অন্যান্য গ্যাস বিপণন প্রতিষ্ঠানের ন্যায় জালালাবাদ গ্যাসের আওতাধীন সিএনজি স্টেশনসমূহের লোড দৈনিক ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে ২০ ঘণ্টা এবং মাসিক ২৬ দিনের পরিবর্তে ৩০ দিন বিবেচনা করে বর্তমান অনুমোদিত লোড বৃদ্ধি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।

এদিকে, এমন বাস্তবতায় সিলেটের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে লোড বাড়ানো না হলে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির হুমকি দিয়েছে সর্বস্থরের সড়ক পরিবহণ শ্রমিকরা।

স্মরকলিপিতে উল্লেখ করা হয়- প্রায় ৩০-৪০ হাজার মিনিবাস, পিকআপ, নোহা, কার, হাইয়েছ, সিএনজি, লেগুনা শ্রমিকদের গ্যাস সংকটের কারণে ঘন্টার পর ঘন্টা পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা, দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করে গ্যাস নিতে না পারা, গ্যাস নিতে অনিদ্রায় থাকার কারণে পরদিন গাড়ী চালাতে অসুবিধা হওয়া, দৈনন্দিন খরচ বহনে হিমশিম খাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

এ অবস্থায় পরিবহণ শ্রমিক নেতারা আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিলেটের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে লোড বাড়ানোর দাবি জানান। অন্যথায় আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সিলেট জেলার সকল সিএনজি পাম্পে অনির্দিষ্টকালের জন্য গ্যাস, তেল নেওয়া বন্ধসহ সর্বস্থরের সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের কর্মবিরতি পালনের নির্দেশ দেন।

ফয়েজ আহমদ শিবগঞ্জের সুরমা অটোকেয়ার প্রাঃ লিঃ গ্যাস পাম্পের স্বত্তাধিকারী ও বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন এন্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স এসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক। তার নিজের পাম্প ১৯ ফেব্রুয়ারী থেকে বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, গ্যাসের লোড নিয়ে আমরা শুধু সমস্যা না মহাসমস্যায় পড়েছি। লোড বৃদ্ধির দাবীতে আমরা গত ১৮ ফেব্রুয়ারী সিলেট সফরে এলে সরকারের খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সাথে আমরা সাক্ষাৎ করেছি, লিখিত চিঠি দিয়েছি। তিনি তখন আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন সিলেট থেকে গ্যাস উৎপাদিত হয়, সেই গ্যাস সিলেটীদের পাওয়ার অগ্রাধিকার রয়েছে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলেও আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছেনা। ১৯ ফেব্রুয়ারী থেকে চলতি মাসের লোড শেষ হওয়ায় আমার পাম্প বন্ধ রয়েছে। ইতোমধ্যে সিলেটের অধিকাংশ পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শবেবরাতের কারণে আপাতত আমরা কঠোর কর্মসূচীর দিকে যাচ্ছিনা। তবে লোড বৃদ্ধি না হলে শীঘ্রই কঠোর কর্মসূচীর ঘোষণা হতে পারে।

সিলেট জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি ও সিলেট জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম বলেন, মাসের আগে পাম্পে গ্যাসের লোড শেষ হওয়া নিয়ে আমরা মহাসংকটে পড়েছি। মাসের ১৮ তারিখ হওয়ার পরপরই সিলেটের অধিকাংশ পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। সিলেট হচ্ছে পর্যটন নগরী তাই এই সময়গুলোতে চালকদের সীমাহিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এতে বিপাকে পড়েন সিলেটে আসা পর্যটকগণ। আর দোষ হয় পরিবহন শ্রমিকদের। তাই সিএনজি পাম্পে পুরো মাস গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাসহ আরো কয়েকটি দাবীতে আমরা ২৭ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত প্রশাসনকে সময় দিয়েছি। এর মধ্যে সমস্যা সমাধান না হলে ২৮ ফেব্রুয়ারীর পর আমরা পরিবহন শ্রমিক কর্মবিরতিসহ কঠোর কর্মসূচী দিতে বাধ্য হবো।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন এন্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স এসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় সভাপতি আমিরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, মাসিক লোড শেষ হওয়াজনিত কারণে সিলেটে গ্যাস পাম্প ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাসের ১৮ তারিখের পর সিলেটের অধিকাংশ পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। যেগুলো খোলা থাকে সেসব পাম্পে রাত ৩টা পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ লাইন থাকে। একজন চালক রাত ৩টায় গ্যাস লোড করে পরদিন গাড়ী চালাবে কিভাবে? এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। আমরা দীর্ঘদিন থেকে লোড বৃদ্ধির দাবীতে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচী পালন করেছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি, চিঠি দিয়েছি। কিন্তু ফলাফল আসেনি। তাই এখন আমরা কঠোর কর্মসূচীর দিকে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, শনিবার রাতে আমরা এসোসিয়েশনের কার্যালয়ে জরুরী বৈঠকে মিলিত হয়েছি। এতে কর্মসূচীর ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলো ২৮ ফেব্রুয়ারী কর্মসূচী ঘোষণা করেছে। তাদের সাথেও আমরা আলাপ আলোচনা করছি। আজকালের মধ্যে আমাদের চূড়ান্ত কর্মসূচী ঘোষণা হবে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর