বসন্ত এলেই লাল রঙে ঢেকে যায় মানিগাঁও। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পশ্চিম পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলবাগান এ সময় রূপ নেয় আগুনরঙা এক স্বর্গে। ডালভরা রক্তিম ফুল আর মাটিজুড়ে পড়ে থাকা পাপড়ি মিলিয়ে পুরো এলাকা যেন লাল চাদরে মোড়া। সেই সৌন্দর্যকে ঘিরেই শনিবার দিনব্যাপী বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে এখানে।
মানিগাঁওয়ের এই বাগান এখন জেলার অন্যতম আকর্ষণ। নদী, হাওর আর দূরের পাহাড় তিনের মিলিত দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের টানে বারবার। ২০০০ সালে বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন ১০০ বিঘা জমিতে তিন হাজার শিমুলগাছ লাগিয়ে গড়ে তোলেন বাগানটি। তার মৃত্যুর পর বর্তমানে পরিবারের সদস্যরাই দেখাশোনা করছেন। এ বাগানে বসন্ত মৌসুম এলেই বাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়।
২০২৩ সাল থেকে জেলা শিল্পকলা একাডেমি এই শিমুলবাগানেই বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে। লাল ফুলের ছায়ায় গান, নাচ ও কবিতায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।
সুনামগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী জানান, বেলা ১১টায় উৎসবের উদ্বোধন করেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সই গো...’ গানের মাধ্যমে শুরু হয় আয়োজন। এবারের উৎসবে জেলার প্রায় ২০০ জন শিল্পী অংশ নেন। সংগীত, নৃত্য, কবিতা, আদিবাসী ও পাহাড়ি নৃত্য এবং বাউল গানে দিনভর প্রাণবন্ত ছিল উৎসব।
দর্শনার্থীদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। সিলেট থেকে আসা রাকিব উদ্দীন হিমেল বলেন, ছবিতে দেখেছি কিন্তু সামনে এসে অনুভূতিটা একেবারেই আলাদা। শিমুলের লাল আর যাদুকাটার নীল জল মিলিয়ে অসাধারণ দৃশ্য। সারাদিন কিভাবে চলে গেছে বুঝতেই পারিনি।
ঢাকার বিক্রমপুর থেকে বন্ধুদের নিয়ে আসা তাসনিয়া রহমানের জানান, এখানে এসে শহরের ক্লান্তি ভুলে গেছি। ফুলের নিচে বসে গান শোনা সত্যিই অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এখানে এসে বসন্তের আনন্দ যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এখানে থেকে যেতে পারলে ভালো লাগতো কিন্তু এখানে থাকার সু ব্যবস্থা নেই। এদিকে নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করি।
স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমাদের এলাকার এই জায়গাটা সারা দেশে পরিচিত হচ্ছে, এটা গর্বের। তবে সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে সবাইকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। আমাদের এখানের রাস্তার খুব খারাপ অবস্থা। নতুন সরকার যেন শিমুল বাগানে আসার যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে নজর দেয়, এটাই কামনা করি।
প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের ছেলে রাখাব উদ্দিন জানান, দর্শনার্থীদের জন্য বাগানে ক্যানটিন ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি গেস্টহাউস নির্মাণ করা হয়েছে। সামনে রিসোর্ট, সৌন্দর্যবর্ধনসহ আরও কিছু উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে।
বসন্ত আসে, আবার ফুরিয়েও যায়। কিন্তু যাদুকাটার পাড়ে শিমুলের এই আগুনরঙা আয়োজন স্মৃতিতে থেকে যায় দীর্ঘদিন। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মিলনে গড়ে ওঠা এই উৎসব এখন সুনামগঞ্জের গর্ব—যা ধরে রাখতে প্রয়োজন সবার সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ।
আজকের সিলেট/প্রতিনিধি/এপি
সংবাদদাতা 








