প্রেম নাকি চুরি? বাবুলের দুই বক্তব্যে রায়নগর ট্রিপল মার্ডারের রহস্য আরও ঘনীভূত
শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৫৩ PM

প্রেম নাকি চুরি? বাবুলের দুই বক্তব্যে রায়নগর ট্রিপল মার্ডারের রহস্য আরও ঘনীভূত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১/০৮/২০২৬ ০৩:৫৬:৩৫ PM

প্রেম নাকি চুরি? বাবুলের দুই বক্তব্যে রায়নগর ট্রিপল মার্ডারের রহস্য আরও ঘনীভূত


রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত বাবুল মিয়ার দুই দফা বক্তব্য ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা বললেও আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণের কথা জানিয়েছে সে। ফলে কোন বক্তব্যের পেছনে প্রকৃত ঘটনা লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য।

চার দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় বাবুল মিয়া। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বাবুল মিয়া ট্রিপল মার্ডারের দায় স্বীকার করে জবানবন্দির তথ্য নিশ্চিত করে সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আসামি আদালতে দোষ স্বীকার করেছে। তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে স্বীকারোক্তির বিস্তারিত তথ্য তিনি জানাতে পারেননি।

আদালতে বাবুল দাবি করেছে, বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে চুরি করার উদ্দেশ্যে রায়নগরের ১১১ নম্বর বাসা ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় ঢুকেছিল সে। তাকে দেখে ফেলায় প্রথমে গৃহপরিচারিকা তাহমিনা, পরে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকে সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে একাই হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে সে। জবানবন্দি শেষে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানান।

পুলিশের কর্মকর্তার বর্ণনা অনুযায়ী, বাবুলের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ১২ আগস্ট সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে সে ওই বাসায় যায়। সিঁড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকার বিষয়টি আগে থেকেই জানত। তাই বেলকনি দিয়ে একটি খোলা কক্ষে ঢোকে। সেখানে তাহমিনার মুখোমুখি হলে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে ছুরিকাঘাত করে। তাহমিনার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করে। পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার ঘটনাটি দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করার কথা জানিয়েছে বাবুল।

তিনজনকে হত্যার পর বাথরুমে গিয়ে শরীরে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করে বাবুল। এরপর টাকা খুঁজতে গিয়ে ৫০০ টাকার নোটে মোট ১৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা জানিয়েছে সে। আরও টাকা বা মালামাল নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাসার মোবাইল ফোন বেজে ওঠা ও মূল দরজার পাশে কারও কথাবার্তা শুনে দ্রুত বারান্দা দিয়ে নিচে নেমে যায়। পরে মেলার মাঠে গিয়ে বসে থাকার কথা জানায় বাবুল। বিকেলে বাসায় ফিরলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

কিন্তু এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বাবুলের আগের বক্তব্য নিয়ে। গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে সে গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা বলেছিল। অথচ আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সেই সম্পর্কের কথা না বলে চুরিকে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

একই ঘটনায় পুলিশের কাছে এক বক্তব্য এবং আদালতে আরেক বক্তব্য কেন এই পরিবর্তন? গৃহপরিচারিকার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা বলা বক্তব্যটি কি সত্য, নাকি বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড়ে চুরির উদ্দেশ্যে হত্যার বর্ণনাই প্রকৃত ঘটনা? নাকি এই দুই বক্তব্যের আড়ালে রয়েছে আরও কোনো কারণ? এই ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের কারণে রায়নগরের ট্রিপল মার্ডারের প্রকৃত মোটিভ নিয়ে নতুন করে সন্দেহ ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

পুলিশের কাছে প্রেমের সম্পর্কের দাবি, আর আদালতে চুরির উদ্দেশ্যে হত্যার স্বীকারোক্তি বাবুল মিয়ার এই দুই বক্তব্যে রায়নগরের তিন খুনের রহস্য কাটার বদলে যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে নগরীর রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলায় তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই ওই দিন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনিতে অভিযান চালিয়ে বাবুল মিয়াকে (৪০) গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধারের অভিযান চালানো হয়। পরে ১৩ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়ার দেখানো স্থান থেকে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের দাবি, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পূর্বপরিচিত হওয়ায় ঘটনার দিন তিনি ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে বাবুল তাহমিনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করলে তিনি এতে অমত প্রকাশ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়।

একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন বলে পুলিশ জানায়। এ সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে রায়নগর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে যান বলে পুলিশের দাবি। পরে পুলিশের বিশেষ টিম সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।

হত্যাকান্ডের তিনদিন পর গত ১৪ আগস্ট রাতে সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে কতোয়ালি থানায় এ মামলা দায়ের করেন। তবে মামলার এজাহারে বাবুল মিয়ার নাম ছিলো না। ১৬ আগস্ট সকালে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক ফারহানা সুলতানা চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গ্রেফতারকৃত বাবুল মিয়া রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আখতার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা ছিলেন। তার বাবার নাম মৃত নূর মিয়া।

জানা যায়, নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর