সিলেট নগরীর রায়নগর রাজবাড়ী আবাসিক এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসা ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার বাবুল মিয়ার চার দিনের রিমান্ড বুধবার শেষ হচ্ছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার বাবুল মিয়াকে আদালতে হাজির করা হবে। এ সময় তিনি চাইলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিতে পারেন। তবে তদন্তের স্বার্থে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে পুলিশ পুনরায় রিমান্ডের আবেদন করতে পারে।
এর আগে গত রোববার সকাল ১১টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার দেখিয়ে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালতের বিচারক ফারহানা সুলতানা চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, রং করার কাজের সূত্রে নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয় ছিল। তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে। তবে তাঁদের সম্পর্ক প্রেমের পর্যায়ে ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বুধবার সকালে বাবুল মিয়া একটি ছুরি নিয়ে ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় যান। দরজায় নক করলে গৃহকর্মী তাহমিনা দরজা খুলে তাঁকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে তাহমিনার সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে বাবুল মিয়া তাহমিনাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন বলে পুলিশের কাছে দেওয়া প্রাথমিক বর্ণনায় উঠে এসেছে। এ সময় গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁর সঙ্গেও ধস্তাধস্তি হয় এবং তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁর সঙ্গেও বাবুলের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
এরপর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল মিয়া ছোরাটি রায়নগর এলাকার একটি খালি জায়গায় ফেলে দেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকালে ওই স্থান থেকে একটি ছোরা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা ছোরায় শুকনো রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনার সঙ্গে ছোরায় থাকা রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে।
এ ছাড়া ঘটনাস্থলের বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানেও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ মিলেছে। এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে উদ্ধার করা ছোরাটির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ ছিল, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া গৃহকর্মী তাহমিনার আচরণে ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। ওই ক্ষোভ থেকেই তিনি ছুরি নিয়ে বাসাটিতে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত বিরোধ, নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল—তা এখনো নিশ্চিত নয়। রিমান্ডে পাওয়া তথ্য, জব্দ করা আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, গত বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা ২৫ মিনিট থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। পরে দ্রুত একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।
প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাবুল মিয়াকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
নিহত আব্দুস সাত্তার (৮২) সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ও প্রবীণ ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের বয়স ছিল ৭৬ বছর। তাঁদের সঙ্গে বাসায় থাকতেন গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫)।
নিহত দম্পতির প্রবাসী সন্তানরা দেশে ফেরার পর গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) আসরের নামাজের পর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহ ময়দানে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁদের মানিক পীরের টিলায় দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতদের সন্তানদের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এখন রিমান্ডে পাওয়া তথ্য, জব্দ করা আলামত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত কতটা এগোয়, সেদিকেই নজর রয়েছে।
আজকের সিলেট/এপি









