ইউনূসের থ্রি ইডিয়টস
শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৬:০০ PM

ইউনূসের থ্রি ইডিয়টস

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫/০৬/২০২৬ ১১:২৮:৪৭ AM

ইউনূসের থ্রি ইডিয়টস


আমির খানের কালজয়ী সিনেমা থ্রি ইডিয়টসের কথা মনে আছে? ওই সিনেমায় তিন মেধাবীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানা ঘটনার মাধ্যমে শিক্ষার আসল লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছিল। সিনেমাটির তিন শিক্ষার্থীর দুষ্টামি ছিল নির্দোষ।

কিন্তু ইউনূস সরকারের আমলে থ্রি ইডিয়টস হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তিন উপদেষ্টার দুষ্টুামি ছিল ভয়ংকর। তাদের ষড়যন্ত্র এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হয়েছিল কোটি মানুষ। ইউনূসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই তিনজনের অপকর্মের কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে বহু বছর।

সিনেমার থ্রি ইডিয়টসকে শাসন করতেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান। কিন্তু অন্তর্র্বর্তী সরকারের থ্রি ইডিয়টসকে লালন-পালন করতেন স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউনূস সরকারের আমলে যত অপকর্ম হয়েছে, তার সবগুলোর সঙ্গেই জড়িত ছিলেন এই তিন উপদেষ্টা। ড. ইউনূসের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজের স্বার্থ উদ্ধার। ইউনূস দেড় বছরে যেখানে পেরেছেন সেখানেই সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। নিজের মামলা প্রত্যাহার, কর মওকুফসহ সব মামলা থেকে মুক্তি আদায় করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন। তার এ অবাধ স্বজনপ্রীতির জন্য দেশে এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার ছিল। সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন এই তিন উপদেষ্টা।

এরা শুধু ইউনূসকেই অবাধে লুণ্ঠন করার সুযোগ করে দেননি, নিজেরাও সীমাহীন লুটপাট করেছেন। ইউনূস এবং তার তিন ইডিয়টের মূল লক্ষ্য ছিল, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা। এই তিন দুষ্ট কোকিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিলেন। এদের বিভিন্ন অপকর্মের সহযোগী হিসেবে আরও কয়েকজন উপদেষ্টা যুক্ত ছিলেন।

কিন্তু ইউনূস সরকারের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এই তিন উপদেষ্টা। এরা হলেন- আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

মজার ব্যাপার হলো, এই তিন উপদেষ্টাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে আদিলুর রহমান সবচেয়ে সিনিয়র হলেও ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন আসিফ নজরুল। আসিফ নজরুল ছিলেন অন্তর্র্বর্তী সরকারে ইউনূসের পরই ক্ষমতাবান।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ছাত্রনেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসিফ নজরুল নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হতে চেয়েছিলেন। এ প্রস্তাব ’২৪-এর ৫ আগস্ট সেনাসদরের বৈঠকেও উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রনেতারা শেষ পর্যন্ত ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার ব্যাপারে অনড় থাকায় আসিফ নজরুলের স্বপ্নভঙ্গ হয়। আসিফ নজরুল যখন বুঝতে পারেন, ইউনূসই হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টা, তখন তিনি উপদেষ্টামণ্ডলীতে নিজের পছন্দের লোকদের ঢোকাতে চেষ্টা করেন।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মাহফুজ আলম, বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, পাঁচ আগস্ট বঙ্গভবনের বৈঠকের পর কয়েকজন ছাত্রনেতাকে নিয়ে আসিফ নজরুল তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসভবনে রাতভর বৈঠক করেন। এ বৈঠকে আসিফ নজরুল উপদেষ্টা পরিষদে আদিলুর রহমান ও রিজওয়ানা হাসানের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন।

ইউনূস দেশে ফেরার পর আসিফ নজরুল বুঝিয়ে দেন যে, ছাত্ররা তার হাতের মুঠোয়। এ কারণে, ইউনূস তার সঙ্গে সমঝোতা করেন। আসিফ নজরুল অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির মানুষ। তিনি জানতেন ইউনূস কী চান। এজন্য আসিফ নজরুল প্রথমেই ইউনূসের মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউনূসের মামলা প্রত্যাহারে সরাসরি বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করেন আসিফ নজরুল। উচ্চ আদালতের একাধিক বিচারপতিকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই আইন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। আসিফ নজরুল শিক্ষার্থীদের দিয়ে মব করিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সব বিচারপতিকে একযোগে পদত্যাগে বাধ্য করেন।

একাধিক আইনজীবী মনে করেন, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এ বাজে দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন আইনজীবীরা। এরপর বিচারপতি নিয়োগে আসিফ নজরুল সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার করেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আসিফ নজরুল বিচারবিভাগের যে ক্ষতি করেছেন, তা অতীতে কেউ করেনি। ইউনূস সরকারের দেড় বছর বিচার বিভাগ চলেছে আসিফ নজরুলের একক কর্তৃত্বে। বিচারকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আইন উপদেষ্টা তার ইচ্ছা অনুযায়ী আদেশ ও রায় দিতে বাধ্য করেছেন।

বিচারক নিয়োগ থেকে শুরু করে সরকারি আইনজীবী নিয়োগ- প্রতিটি ক্ষেত্রে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ধ্বংসের জন্য ইতিহাসে আসিফ নজরুল চিরকাল একটি কলংকিত নাম হয়ে থাকবে। আসিফ নজরুল জোর করেই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে তিনি লুটপাটের এক ভাণ্ডার খুলে ফেলেন। একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিককে ভয় দেখিয়ে আসিফ নজরুল মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজন ছাড়াই নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদানের নামে আসিফ নজরুল অন্তত ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জানান, ৫ কোটি টাকা দিয়ে তিনি নতুন লাইসেন্স নিয়েছেন। আসিফ নজরুল কেবল তার নিজের মন্ত্রণালয়েই দুর্নীতি-লুটপাট করেননি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তদবির বাণিজ্য করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আসিফ নজরুলের দুর্নীতির একটি বড় জায়গা ছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। শুরু থেকেই পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

ইউনূস সরকারের প্রথম দুই মাস সব পদোন্নতি এবং বদলি হয়েছে আসিফ নজরুলের মাধ্যমে। কিন্তু দুই মাস পর, ছাত্র উপদেষ্টারা যখন বুঝতে শেখেন তখন বদলি বাণিজ্যে তারাও হস্তক্ষেপ শুরু করেন। এ সময়ে আসিফ নজরুলের সঙ্গে ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরোধ শুরু হয়।

বিশেষ করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদায়নে আসিফ নজরুলের সঙ্গে আসিফ মাহমুদের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আসিফ নজরুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্নীতি করেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে টেন্ডার বাণিজ্য করে রিজওয়ানা হাতিয়ে নিয়েছেন শত কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, এবি সিদ্দিকী নসরুল হামিদ বিপুর বিভিন্ন সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের মধ্যস্থতাও করেছেন। রাজধানীর গুলশান ক্লাবের বিপরীতে নসরুল হামিদের নামে থাকা এক বিঘা জমির একটি প্লট নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নসরুল হামিদের সম্পত্তি ক্রোকের উদ্যোগ নিলেও এই প্লটটি তালিকায় ছিল না। অনুসন্ধানে অভিযোগ ওঠে, রিজওয়ানার তদবিরে এটি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমান বাজারমূল্যে জমিটির দাম প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হয়।

রাজধানীর মাদানি এভিনিউর ১০০ ফুট রাস্তার পাশেও নসরুল হামিদের প্রায় ৫ বিঘা জমি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বড় আকারে ক্রেতা না পাওয়ায় ছোট ছোট অংশে জমি বিক্রির চেষ্টা চালান এবি সিদ্দিকী। একই সঙ্গে হামিদ রিয়েল এস্টেটের অঘোষিত মালিক হিসেবেও তাকে উল্লেখ করা হয়। পলিথিন বাণিজ্য নিয়েও নানান বিতর্ক রয়েছে। উপদেষ্টা হওয়ার পর রিজওয়ানা পলিথিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং শপিং মলে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। কিছুদিন অভিযান চললেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, পলিথিন উৎপাদকদের সঙ্গে সমঝোতার পর অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্র নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তা কার্যকর হয়নি। কয়েক মাস ধরে পাথর উত্তোলন চলার পর পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এ ছাড়া পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে হলে বিভিন্ন তদবির করতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক উদ্যোক্তার দাবি, উপদেষ্টার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অনেক সময় অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। বন অধিদপ্তরের পদায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

কিছু লাভজনক পদে নিয়োগ বা বদলির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ ওঠে। একইভাবে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে কিছু প্রকল্পে টেন্ডার ছাড়াই কাজ দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, গবেষণার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কোনো গবেষণা হয়নি। ইটভাটার লাইসেন্স প্রদান নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নানান অনিয়ম হয়েছে এবং এ কারণে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ছিলেন গুপ্ত দুর্নীতিবাজ। তিনি কথা বলতেন কম, ষড়যন্ত্র করতেন বেশি। প্রাক্তন জাসদ কর্মী ছিলেন, তাই ষড়যন্ত্রই ছিল তার মূল অস্ত্র। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন বানচালের মূল ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন আদিলুর।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওসমান হাদির মৃত্যুর পর সারা দেশে মব সৃষ্টির মূল কারিগর ছিলেন এই উপদেষ্টা। মব সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এজন্যই দুটি সংবাদপত্র অফিসে হামলা চালানো হয়। এ সময় পুলিশ যেন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে সেজন্য আদিলুর নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারী পদত্যাগ করেন।

তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও ইউনূস কোনো ব্যবস্থা নেননি। এই তিন উপদেষ্টাই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পাঁচ আগস্টের পর সারা দেশে মব সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। দেড় বছরে ইউনূস সরকারের সব নৈরাজ্য আর অপকর্মের প্রধান দোসর হলেন এই থ্রি ইডিয়টস। এসব অভিযোগের ব্যাপারে মতামত জানতে, সাবেক এই তিন উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনজনের কেউই ফোন রিসিভ করেননি। তাদের মেসেজ দেওয়া হলেও তারা জবাব দেননি।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর