মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগর এলাকার ‘মেঘ মালতি’ রিসোর্টে গোপনীয়তা নষ্ট করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ তুলেছেন এক তরুণ। তবে এ ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ পাল্টা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষ মেঘ মালতি রিসোর্টের নাম পরিবর্তন করে নতুন করে নাম দিয়েছে ‘বেলা শেষে’।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুলাই মৌলভীবাজারের ওই তরুণ ও এক তরুণী রিসোর্টে যান। রিসোর্টের পরিচয়পত্রে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেও বাস্তবে তারা প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলেন। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রিসোর্টের ১০১ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন। রিসোর্ট ত্যাগ করার পর ওই তরুণের হোয়াটসঅ্যাপে আপত্তিকর ছবি দিয়ে টাকা দাবি করেন একজন। এমন অভিযোগ নিয়ে শহর থেকে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন রিসোর্টে যান তিনি।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয়; রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ও তাদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। তিনি একটি নম্বর দেখিয়ে বলেন এই নম্বর থেকে ছবি পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে। একইসঙ্গে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য রিসোর্টের ম্যানেজারকে বলা হয়। পুরো বিষয়টি ম্যানেজার জাহাঙ্গীর অস্বীকার করলে মারামারি শুরু হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় এলাকাবাসী ও প্রশাসনের লোকজন আসেন। পরবর্তীতে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেন ওই তরুণ। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বায়নামা করে উভয় পক্ষকে ছেড়ে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে প্রয়োজনে মামলা করার কথা বলা হয়। তবে এ ঘটনার কয়েকদিন পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ রিসোর্টের নাম ‘মেঘ মালতি’ পরিবর্তন করে নতুন নাম ‘বেলা শেষে’ রেখেছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা বলেন, শহর থেকে লোকজন এসেছে, এজন্য আমাদের ডাকা হয়। এখানে আসার পর ওই ছেলেটা একটা নম্বর দেখিয়ে বলেছে এই নম্বর থেকে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা দাবি করেছে। পরে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখি নম্বরটি আমাদের এলাকার এক জনের। সে রিসোর্টে কাজ করে। এলাকার মুরুব্বিরা তাকে জুমার নামাজের পর আসার জন্য বলেন, সে কিন্তু আসেনি। বাস্তবে এখানে কী ঘটেছে তা বুঝতে পারছি না। একটা ছবি দেখানো হয়েছে তাও আবার অনেকেই এআই ছবি বলছেন।
স্থানীয় মাদক বিরোধী টিমের সদস্য হাফেজ আবুল হাসেম জানান, ৯ জুলাই শহর থেকে কিছু যুবক ওই রিসোর্টে আসার পর স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে আসেন। যে নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও পাঠিয়ে টাকা দাবি করা হয়েছে সেটি খোঁজ নিয়ে এলাকাবাসী জেনেছেন নম্বরটি রিসোর্টের পার্শ্ববর্তী জেরিন চা বাগানের নাসির নামের এক যুবকের। ঘটনার পর থেকে নাসির লাপাত্তা। তার মুঠোফোনও বন্ধ।
বিষয়টি নিয়ে ওই তরুণ সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ৮ জুলাই মেঘ মালতি রিসোর্টের একটি রুম বুকিং দিই। আমার সঙ্গে একজন ছিল। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছিলাম। এখান থেকে আমরা যাওয়ার পর আমাদের প্রাইভেসি নষ্ট করা হয়। পরে এগুলো আমার হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া হয়, একইসঙ্গে টাকা দাবি করা হয়। কখনো ৩০ হাজার, আবার কখনো ১৫ বা ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে আমরা সবাই রিসোর্টে যাই বিষয়টি সমাধান করার জন্য। তবে তারা আমাদের সঙ্গে মারামারি শুরু করে দেয়।’
রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গত ৯ জুলাই এক যুবক একটা স্ক্রিনশট দিয়ে বলছে রিসোর্ট থেকে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা চাইতেছে। তখন আমি বলি আপনি রিসোর্টে আসেন বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলি। পরে তারা রিসোর্টে এসে আমাদেরকে গালাগালি ও মারধর করে। একপর্যায়ে তারা আমাদের কাছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দাবি করে। তারা বলে ভিডিও দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে আমরা এই টাকা নিয়েছি। তখন আমরা বলি কার কাছে টাকা দিয়েছ। পরে হল্লাচিল্লা শুনে এলাকার মানুষ চলে আসে। পরে সে আবার টাকা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। ঘটনার এক পর্যায় টুরিস্ট পুলিশসহ প্রশাসনের লোকজন চলে আসে। ছেলেটা রিসোর্টে থাকার জন্য মেয়েটাকে তার স্ত্রী পরিচয় দিয়েছে। পরে শোনা যায় মেয়েটি তার স্ত্রী নয়। আমরাতো কথার ওপর বিশ্বাস করেছি। আমরাতো আর কাবিননামা দেখতে পারি না।’
নাম পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বাড়িতে চলে এসেছি। মালিক পক্ষ নাম পরিবর্তন করেছে মনে হয়। বিষয়টি আমি পুরোপুরি জানি না।’
অভিযোগকারী তরুণ বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে যা ঘটেছে, সবাই দেখেছে। এ বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সমাধান হয়নি। আমার পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করিনি। আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা চেয়েছে, আমি তাদেরকে টাকা দেইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার দুজন আত্মীয় আছেন, তারা দেখতেছেন। প্রয়োজনে তারা কথা বলবেন। এই বিষয়ে কথা বলার মানসিকতা আমার নেই।’
রাধানগর ট্যুরিজম এন্ট্রাপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস দাশ বলেন, ‘যখন এই ঘটনা ঘটে তখন আমরা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বিষয়টি দেখা হবে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মামলা করার জন্য বলা হয়েছে। আমাদেরকে যে ছবিটি দেখানো হয়েছে, সেটি এই রিসোর্টের ওয়ালের কালারের সঙ্গে মিল নেই। আমাদের কাছে এআই ছবি মনে হয়েছে।’
বিষয়টি নিয়ে শ্রীমঙ্গল ট্যুরিস্ট পুলিশ জোনের ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এক ছেলে তার প্রেমিকা নিয়ে রিসোর্টে এসেছিল। তার দাবি আপত্তিকর ভিডিও করা হয়েছে। সে বলেছে একটা স্ক্রিনশর্ট হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা দাবি করা হয়েছে। আসলে স্ক্রিনশর্টের ছবিটি কতটুকু সত্য তা এখনও বোঝা যায়নি। আমরা ঘটনার দিন রিসোর্টে যাওয়ার পর এলাকার লোকজন নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করে দেওয়া হয়েছে লিখিতভাবে। বলা হয়েছে প্রয়োজনে উভয়পক্ষ মামলা করেন। এখন কেউ যদি মামলা না করেন তাহলে কিছু করার নেই।’
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি সরকার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রিসোর্টের ঘটনায় লিখিত বা মৌখিক কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ওই ছেলের সঙ্গে কথা বলেছি, সে বলেছে তার কোনো অভিযোগ নেই। তাদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল, সেটা সমাধান হয়েছে। রিসোর্টের নাম পরিবর্তন হয়েছে কি না সেটা আমার জানা নেই।’
আজকের সিলেট/এপি









