সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া ৬০ লাখ টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে। এ অর্থের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের দাবিতে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন বিদ্যালয়ের ভূমিদাতা, দাতা সদস্য ও অভিভাবকদের একাংশ। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রণধীর মন্ডলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদিউজ্জামান আহমদ। পাশাপাশি অর্থের হিসাব যাচাইয়ে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর পৃথক আবেদন ও অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিদ্যালয়ের নতুন ২০ জন আজীবন দাতা সদস্যের কাছ থেকে পাওয়া ৬০ লাখ টাকার আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে আগে অর্থ দেওয়ার পরও কয়েকজনকে দাতা সদস্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ‘মোবারকপুর বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এটি ‘মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টি অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তার ও পরিচালনা নিয়ে বিরোধের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার পরিবেশে; দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমছে বলে দাবি তাদের।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পদ-পদবি, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, মনোনীত ব্যক্তিদের আজীবন দাতা সদস্য করা এবং প্রকৃত দাতাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নতুন ২০ জন আজীবন দাতা সদস্যের কাছ থেকে নেওয়া ৬০ লাখ টাকার হিসাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখার ২০২৪ সালের ১৬ মে জারি করা প্রজ্ঞাপনে আজীবন দাতা সদস্য হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা সমমূল্যের জমি দানের বিধান উল্লেখ রয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা, পৌর এলাকায় ৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য এলাকায় ন্যূনতম ৩ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পে-অর্ডারের মাধ্যমে দান করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত সভার কার্যবিবরণীতে দাতার নাম ও ঠিকানাসহ দানের প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকার কথা রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে আজীবন দাতা সদস্যদের তালিকা প্রকাশ ও প্রদর্শন করা হয়েছে। আবার ইচ্ছামতো তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমিনুল হক রিপন, হাজী আব্দুল করিম ও বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আবুল লেইচ অর্থ দেওয়ার পরও আজীবন দাতা সদস্যের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
এ বিষয়ে বাদ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা এবং নতুন ২০ জন দাতা সদস্যের কাছ থেকে পাওয়া ৬০ লাখ টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব সাত দিনের মধ্যে জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এডহক কমিটির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য এডহক কমিটির তালিকা প্রকাশ করে। এর আগে বিদ্যালয়ের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ক্লাস বন্ধ রেখে ‘মোবারকপুর উচ্চ বিদ্যালয় উন্নয়ন কমিটি’ নামে আরেকটি কমিটি প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। বিদ্যালয়ের হলরুমে ওই কমিটির তালিকা প্রকাশের সময় স্থানীয়দের অবজ্ঞা করার অভিযোগে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন অভিভাবক, ভূমিদাতা, দাতা সদস্য ও স্থানীয় ব্যক্তি অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই বিদ্যালয়ের কমিটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রণধীর মন্ডল বলেন, আজীবন দাতা সদস্যদের নামসংবলিত বোর্ড বিদ্যালয়ে লাগানো হয়েছে, তা তিনি দেখেছেন। তবে কারা সেটি লাগিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি জানেন না।
বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি নিখল চন্দ্র দাস বলেন, কারা টাকা তুলেছেন বা বোর্ড স্থাপন করেছেন, তা তাঁর জানা নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প কিছুদিন হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদিউজ্জামান আহমদ বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৬০ লাখ টাকার হিসাব যাচাই করতে নতুন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা থাকায় প্রধান শিক্ষককে শোকজ করা হয়েছে এবং সাত কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
ওসমানীনগর প্রতিনিধি 








