হাওরাঞ্চলের মানুষদের চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন ও ভোগান্তি কমাতে সুনামগঞ্জে দুই দফায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট। কিন্তু নামমাত্র উদ্বোধনের পরও বাস্তবে পুরোদমে কার্যকর হয়নি জীবনরক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসা সেবা। ফলে জেলার প্রায় ২৮ লাখ মানুষের জন্য নির্মিত আইসিইউ ইউনিটটি এখনও সেবা দিতে পারছে না। যদিও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জানিয়েছেন, বর্তমানে এই বিভাগে রোগী রেখে ট্রায়াল দেওয়া হলেও আগামী ডিসেম্বরে পুরো দমে চালু হবে হাসপাতালে এই সেবা কার্যক্রমটি।
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। রোদ, বৃষ্টি ও বজ্রপাত উপেক্ষা করে এ জেলার মানুষকে খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকার জন্য প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু পরিশ্রমী কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ অসুস্থ হলে কিংবা বড় কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে উন্নত চিকিৎসার আশায় ছুটে আসেন জেলার সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালে। অথচ পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স, ওষুধ ও আইসিইউ সুবিধার সংকটে এখানেও অনেক রোগী কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পান না। সংকটাপন্ন রোগীদের প্রাণ বাঁচাতে স্বজনদের ছুটতে হয় সিলেটে। দেশের খাদ্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা হাওরের এই জেলার মানুষ যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।
এই অঞ্চলের মানুষদের চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের অষ্টম তলায় ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়।
২০২৩ সালের ২১ মার্চ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় অত্যাধুনিক লাইফ-সেভিং চিকিৎসা সরঞ্জাম।পাশাপাশি ওই বছরের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন সরকার প্রধান (ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধন করেন। কিন্তু সেই সময় এই ইউনিটটি নামমাত্র উদ্বোধন হলেও তখন সেবায় চালু হয়নি। যা পড়ে থাকে চরম অবহেলা অযত্নে।
এদিকে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার পর চলতি বছরের গেল ১৪ জুন বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মাহবুব আলম দ্বিতীয়বার হাম ডেডিকেটেড আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধন করেন। কিন্তু এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা শুরু হয়নি। ফলে দুই দফায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট।
কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শুধু তাই নয়, তদারকির অভাবে দিন দিন হাসপাতালের প্রথম তালা থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত চারদিকে লেগে আছে নোংরা আর্বজনা। শ্যাযা সংকট থাকায় অনেকে রোগী নোংরা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানায়, দুই দফা আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধন করা হলেও বাস্তবে চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। জেলা সদরের হাসপাতালে আইসিউ সেবা না থাকায় সিলেট শহরে গিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালে ডাক্তার সংকট, ওষুধ সংকট এবং চারদিকে নোংরা থাকায় এখানে রোগী ও তাদের স্বজনরা অতিষ্ঠ।
স্থানীয় বাসিন্দা ময়না মিয়া বলেন, হাসপাতালে একটু জটিল রোগী নিয়ে গেলেই সিলেটে রেফার করে দেওয়া হয়। মাঝে মধ্যে মনে হয় জেলা শহরে এই হাসপাতালে রাখার চাইতে না রাখা ভালো।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদ মিয়া বলেন, এক আইসিইউ ইউনিট ২ বার উদ্বোধন করা হয়েছে অথচ এখন সেবা কার্যক্রম চালু হয়নি। এটা সত্যি দুঃখজনক। সরকারের টাকা খরচ করে একবারের জায়গায় দুইবার উদ্বোধন করা হলো অথচ এই ইউনিটের সেবা কার্যক্রম কবে চালু হবে সেটা কেউ জানে না।
স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াহিদ মিয়া বলেন, হাসপাতালে মাকে নিয়ে ভর্তি ছিলাম তিনদিন। কিন্তু হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে ছারপোকা ভর্তি। খাবার রাখার সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে মাকে প্রাইভেটে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আজম বলেন, হাসপাতালের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত ময়লা আবর্জনা। আর মারাত্মক দূর গন্ধ। এই দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনোও নজরদারি কিংবা তদারকি নেই। পাশাপাশি আমরা চাই আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন হয়েছে যাতে দ্রুত এটির সেবা কার্যক্রম চালু হয়। তাহলে এই অনেক মানুষের উপকার হবে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহম্মদ হোসেন বলেন, বর্তমান এই আইসিইউ চালু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। অল্প কিছু লজিস্টিকের সাপ্লাই বাকি রয়েছে। এগুলো দ্রুত কেনা হবে। আশা করি ডিসেম্বরে এটি সম্পূর্ণভাবে চালু করা যাবে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








