মৌলভীবাজারে করাতকলের দাপট, ঝুঁকিতে সংরক্ষিত বন ও পরিবেশ
শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪৯ PM

মৌলভীবাজারে করাতকলের দাপট, ঝুঁকিতে সংরক্ষিত বন ও পরিবেশ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৯/০৮/২০২৬ ১১:২৬:৩৯ AM

মৌলভীবাজারে করাতকলের দাপট, ঝুঁকিতে সংরক্ষিত বন ও পরিবেশ


৫৩ হাজার ১০৯ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড়ঘেরা মৌলভীবাজারে বৈধ করাতকলের পাশাপাশি বেড়ে চলেছে অবৈধ করাতকল। এসব প্রতিষ্ঠানে দিন-রাত সামাজিক বনায়ন ও বন থেকে চোরাই পথে সংগ্রহ করা গাছ চেরাই হচ্ছে। শুধু বনাঞ্চল বা সড়কের পাশে নয়, কৃষিজমি ভরাট করেও স্থাপন করা হচ্ছে করাতকল। এতে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও প্রতিবেশ পড়ছে মারাত্মক হুমকির মুখে।

সরেজমিনে জেলার কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, সংরক্ষিত বন ও বিভিন্ন সড়কের পাশে অসংখ্য করাতকল গড়ে উঠেছে। এসব করাতকলে বৈধ-অবৈধ বিভিন্ন ধরনের গাছ স্তূপ করে রাখা রয়েছে। সুযোগ বুঝে সেগুলো চেরাই ও বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, রাতের আঁধারে অনেক করাতকলে চোরাই গাছ চেরাই করা হয়, যাতে বিষয়টি সহজে কারও নজরে না আসে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সড়কের পাশের গাছ এবং চা বাগানের ছায়া বৃক্ষও অবাধে বিক্রি হচ্ছে। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে সংরক্ষিত বনের ঘনত্ব আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

সিলেট বিভাগীয় বন অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলায় মোট ১৯৩টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে ১৪২টির লাইসেন্স রয়েছে। অবৈধ করাতকল রয়েছে ১৩টি। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে রিট ও স্বত্ব মামলায় রয়েছে আরও ৪০টি করাতকল।

সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে করাতকলে অবৈধ গাছ চেরাইয়ের প্রবণতাও বাড়ছে। বন বা সড়কের পাশ থেকে গাছ চুরি করে কোনোভাবে করাতকলে পৌঁছে দিতে পারলেই সেটি যেন বৈধতার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। চোরাই গাছ বৈধ গাছের সঙ্গে মিশিয়ে চেরাই করা হলে পরে কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ, তা শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নির্বিচারে গাছ কাটার প্রবণতা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।

জেলার পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, অবাধে গাছ নিধনের জন্য বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায় রয়েছে। তাদের মতে, যত্রতত্র করাতকলের ছাড়পত্র ও লাইসেন্স অনুমোদন না দিলে বন ও পরিবেশের ওপর এমন চাপ তৈরি হতো না। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনের মূল্যবান গাছ প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে। পরে এসব গাছ করাতকলে নিয়ে চেরাই করে বিক্রি করা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী জানান, অনেকেই সড়কের পাশ থেকে গাছ চুরি করে করাতকলে নিয়ে আসেন। সেখানে বৈধ গাছের পাশাপাশি চোরাই গাছও বিক্রি করা হয়। তাদের ভাষ্য, গাছ করাতকলে চেরাই হয়ে যাওয়ার পর সেটি বৈধ নাকি অবৈধ তা আলাদা করে বোঝার সুযোগ থাকে না। অবৈধ করাতকল চালু রাখতে মালিকেরা বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলেন বলেও তারা অভিযোগ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন করাতকলের মালিক জানান, তারা অবৈধভাবেই অনেক করাতকল পরিচালনা করছেন। আবার কেউ কেউ আদালতে রিট করে করাতকল চালু রেখেছেন। তাদের দাবি, বন বিভাগ মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও অবৈধ করাতকলের মালিকেরা তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই কার্যক্রম চালিয়ে যান।

পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় অসংখ্য অবৈধ করাতকল রয়েছে। এসব করাতকল থেকে বন বিভাগের লোকেরা নিয়মিত টাকার ভাগ নেন। এ জন্য কিছু বলেন না। প্রতিনিয়ত গাছ চুরি হচ্ছে, এসব গাছ কোথায় যায়? পরিবেশকে বাঁচাতে হলে প্রথমে অবৈধ করাতকল বন্ধ করতে হবে।’

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের জনবল নেই। এ জন্য অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও লাইসেন্স বন বিভাগ থেকে দেওয়া হয়।’

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর