বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের, বেসরকারি খাতে চ্যালেঞ্জ!
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২০ PM

বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের, বেসরকারি খাতে চ্যালেঞ্জ!

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/০৯/২০২৬ ০৭:২২:৩৪ AM

বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের, বেসরকারি খাতে চ্যালেঞ্জ!


সরকারি কর্মচারীদের নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে বড় মাত্রায় বেতন বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতেও বেতন ও মজুরি সমন্বয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বড় পরিসরে বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই।

ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতন ব্যবধান, দক্ষ কর্মী ধরে রাখা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি সমন্বয়-তিন দিক থেকেই চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকারি পে স্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে সরকারি চাকরিতে বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে একই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কর্মীদের বেতন নিয়ে বেসরকারি খাতেও তুলনা তৈরি হয়। বিশেষ করে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠানকে বেতন-ভাতা পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাধারণত সরকারি পে স্কেল পুনর্নির্ধারণ হলে বেসরকারি খাতেও এর একটি চাপ তৈরি হয়। পরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগে মজুরি বা বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে।

তবে এবার সরকারি কর্মচারীদের বেতন যে মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে, সেটি বেসরকারি খাতের জন্য অনুসরণ করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর নিচের গ্রেডগুলোতে বেতন বাড়ানোর যে যৌক্তিকতা ছিল, তা থাকলেও ওপরের গ্রেডগুলোতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই মাত্রার বেতন বৃদ্ধিকে বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের পক্ষে এখনই একইভাবে পে স্কেল সংশোধন করার সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না।

নিচের গ্রেড হতে পারে বেঞ্চমার্ক
নতুন পে স্কেলের পুরো কাঠামো অনুসরণ করা সম্ভব না হলেও নিচের গ্রেডের বেতন বেসরকারি খাতের জন্য একটি মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

নতুন বেতনস্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। ৯ম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা থেকে মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার টাকা। ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে হয়েছে ৩২ হাজার টাকা।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিশেষ করে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণকে বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের কর্মীদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এ ধরনের বেঞ্চমার্ক বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের কর্মী ও শ্রমিকেরা মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ডের কাছেও যেতে পারেন।

তবে সরকারি পে স্কেলের পুরো মাত্রার বেতন কাঠামো গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা বেসরকারি খাতের নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমবেশি এর সঙ্গে সমন্বয় করতে হতে পারে।

বড় বেতন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ কোথায়
দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে সীমিত। নতুন বিনিয়োগও কম হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারের পরিস্থিতি অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় সরকারি পে-স্কেলের পুরোটা অনুসরণ করে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো কঠিন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেতন বাড়ানো মানে শুধু কর্মীর হাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া নয়। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমব্যয় বাড়ে। বাড়তে পারে কর্মী-সুবিধা, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ব্যয়ও। ফলে বেতন সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজারের প্রতিযোগিতা ও পণ্যের দাম-সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।

এ কারণে বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে পারলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা করা কঠিন হতে পারে। ফলে নতুন পে স্কেলের প্রভাব বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠান ও খাতভেদে ভিন্ন হতে পারে।

দক্ষ কর্মী ধরে রাখার চাপ
সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দক্ষ কর্মী ধরে রাখা নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, হিসাবরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনার মতো দক্ষতাভিত্তিক পেশায় কর্মীরা বিভিন্ন চাকরির সুযোগ তুলনা করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে শুধু মূল বেতন নয়, বোনাস, স্বাস্থ্যসুবিধা, অবসর সুবিধা, কর্মঘণ্টা, পদোন্নতি ও চাকরির নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মজুরি সমন্বয় না করে, তাহলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব উৎপাদন খাতেও পড়তে পারে। তবে বর্তমান শ্রমবাজারের পরিস্থিতির কারণে এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বড় আকার নাও নিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, দেশে নতুন কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় শুধু মজুরি না বাড়ানোর কারণে কর্মীরা ব্যাপকভাবে চাকরি ছেড়ে দেবেন-এমন পরিস্থিতি এখন নেই। বরং অনেক কর্মীর জন্য বর্তমান চাকরি ধরে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।

মূল্যস্ফীতির চাপেও মজুরি সমন্বয় দরকার
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। ফলে সরকারি পে স্কেলের প্রভাবের বাইরে থেকেও বেসরকারি খাতে মজুরি সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ফরমাল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত প্রতিবছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিও পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধু বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নয়, পুরো বেতন কাঠামোই পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে।

সরকারি পে স্কেল বেসরকারি খাতে বাধ্যতামূলক নয়
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ সরকারি চাকরির জন্য প্রযোজ্য। ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে। তবে বাড়তি বেতনের পুরো অর্থ একবারে দেওয়া হচ্ছে না। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বেতনবৃদ্ধির পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তা যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ পূর্ণ বেতন দেওয়ার কথা রয়েছে।

তবে এই বেতনস্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট হারে বাড়বে না।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের ধরন, দক্ষতার চাহিদা এবং শ্রমবাজারের পরিস্থিতিই মূলত বেতন নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

সরকারি বেতন বাড়লে বাজারেও প্রভাব
সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার ফলে তাদের ভোগব্যয় বাড়তে পারে। এতে পণ্য ও সেবার চাহিদায় পরিবর্তন আসতে পারে। বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ সমান হারে না বাড়লে কিছু পণ্য ও সেবার দামে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তখন বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপরও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের হাতে সরাসরি বাড়তি অর্থ যাবে না। কিন্তু বেতন প্রতিযোগিতা, দক্ষ কর্মী ধরে রাখার ব্যয়, পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মাধ্যমে তাঁদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

সবার বেতন একই হারে বাড়বে না
নতুন পে স্কেলের প্রভাব বেসরকারি খাতে একরকম হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বেশি, তারা দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে বেতন-ভাতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অনেকের পক্ষে তা করা সম্ভব নাও হতে পারে।

ফলে সরকারি চাকরিতে যেখানে নতুন বেতনস্কেলের প্রভাব সরাসরি ও বিধিবদ্ধ, বেসরকারি খাতে তা হবে মূলত বাজারনির্ভর। কোথাও বেতন বাড়তে পারে, কোথাও কেবল বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাড়তে পারে, আবার কোথাও বেতন কাঠামো অপরিবর্তিতও থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে নতুন পে স্কেলের বড় প্রশ্নটি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়া নয়। এর প্রভাব বেসরকারি শ্রমবাজার কতটা সামলাতে পারবে, সেটিও। সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বেসরকারি খাতে মজুরি সমন্বয়ের চাপ তৈরি হলেও অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সেই চাপ কতটা পূরণ করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় বিষয়।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর