ভরা মৌসুমে যেমন খুশী দামে সার বিক্রয় হচ্ছে বোর প্রধান এলাকা হাওরাঞ্চলে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৫০ কেজির বস্তা ৮০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দামে বাধ্য হয়ে সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাবডিলাররা দাম বাড়াচ্ছে বলে দাবি করেছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জে এবার দুই লাখ ২৩ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে বোর ধানের চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লাখ ৭০ হাজার ২০২ টন। টাকার অংকে এই ধানের মূল্য পাঁচ হাজার একশ দশ কোটি টাকা। বোরো ধানে সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় মাঘ মাসের শুরু (জানুয়ারি’র মাঝামাঝি সময় থেকেই) থেকেই। উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য চাহিদামত সার সরবরাহও নিশ্চিত করা হয়েছে দাবি করেছে কৃষি বিভাগ।
জানুয়ারি মাসে জেলায় আট হাজার ৯৩৬ টন ইউরিয়া, এক হাজার তিনশ পঁচাশি টন টিএসপি, এক হাজার ৫০০ টন এমওপি ও তিন হাজার ৬৪ টন ডিএপি সার এসেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ইউরিয়া পাঁচ হাজার ১০ টন, টিএসপি চারশ ৫৯ টন, এমওপি চারশ ২৮ টন ও ডিএপি সাতশ দুই টন।
চাহিদা মিটিয়ে শনিবার পর্যন্ত কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী জেলায় দুই হাজার ৫০০ টন ইউরিয়া এবং আটশ থেকে এক হাজার টন অন্যান্য সার মজুদ আছে।
কিন্তু জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় কিছু সার বিক্রেতারা বলছে সার আসছে না, নৌকা আসে নি। পর্যাপ্ত সার নেই। এসব কথা বলে বস্তা প্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দরে সার বিক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। কৃষকরা বলেছেন, সার বিক্রেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে কোন কথাই বলা যায় না। চড়া দামে বিক্রয় করা হচ্ছে সার।
জামালগঞ্জের পণ্ডুব বাজারে ৫০ কেজির সারের বস্তা গেল তিনদিন হয় ১৪০০ টাকায় বিক্রয় করা হয়েছে। ডিলার পয়েন্ট থেকেই ১৩৫০ টাকার সার ১৪০০ টাকায় বিক্রয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওখানকার হরিনাকান্দি গ্রামের কৃষকরা। এছাড়া ১০৫০ টাকা দামের ডিএপি ১২০০ টাকায় কিনেছেন বলেও দাবি করেছেন কৃষকরা।
হরিনাকান্দি গ্রামের কৃষক ইমরুল কায়েস ও হাসান জানালেন, ‘কথাঔ কওয়া (কথাই বলা যায় না) যায় না। ডিলারের (দিগেস চন্দ্র তালুকদার) দোকানে লুৎফুর রহমান নামের একজন বইয়া (বসে) থাকে, সার গোদাম ভরা রাইক্কা (রেখে) বলে সার নেই, নৌকা আইতাছে না (আসছে না), দামাদামি করলে কয় সার নাই।’ এই কৃষকরা জানালেন, এই সময়ে পণ্ডুবের ডিলারের কাছ থেকে কমপক্ষে ১০ হাজার বস্তা সার বিক্রয় হবে।
শাল্লার নাইন্দা গ্রামের কৃষক প্রমুদ দাস বললেন, শাল্লা সদর, আনন্দপুর ও প্রতাপপুর বাজারে ইউরিয়া সার এখন ১৪২০ থেকে ১৪৫০ টাকা বস্তার নীচে কেউই বিক্রয় করছে না। এখানকার বিক্রেতাদের বেশিরভাগই সাবডিলার। তিনি জানালেন, এমওপি সার অনেক কৃষক কিনেছেন ৫০ কেজির বস্তা ১১২০ টাকায়।
এই উপজেলার রামপুরের কৃষক রেবতি দাস বললেন, আনন্দপুরের বাজারের রঞ্জিত রায়’র দোকান থেকে বৃহস্পতিবার সকালেও ৫০ টাকা কেজিতে ইউরিয়া সার কিনেছেন তিনি। সে হিসাবে বস্তার দাম হয় ১৫০০ টাকা।
তাহিরপুরের গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক তাপু আহমেদ বলেছেন, বেশিরভাগ বিক্রেতারাই চড়া দামে বিক্রয় করছে সার।
আনন্দপুর গ্রামের বড় কৃষক মাখন লাল দাস অবশ্য জানিয়েছেন, ভেড়াডহরের বিসিআইসি ডিলার রঞ্জিত কুমার বৈষ্ণবের কাছ থেকে ৫৫ বস্তা সার তিনি সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও ১০ টাকা কমে অর্থাৎ ১৩৪০ টাকা করে বস্তা কিনেছেন।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীণ রাজনীতিবিদ বড় কৃষক আব্দুস ছাত্তার জানিয়েছেন, শাল্লায় ৫০ কেজির ইউরিয়া সার ১৪২০ টাকা বস্তা বিক্রয় হতে তিনিও শুনেছেন।
শাল্লার সার বিক্রেতা সুবীর সরকারকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কেন বিক্রয় করছেন জানতে চাইলে তিনি সরাসরি এসে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। এরপর আর ফোন রিসিভ করেন নি।
দিরাইয়ের বড় কৃষক আব্দুস সাত্তার বললেন, এখন সারের ভরা মৌসুম বিক্রেতাদের কাছে গেলেই বলে সারের সরবরাহ কম। অথচ. কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রচুর পরিমাণে সার মজুদ আছে।
জেলা সিপিবি’র সভাপতি অ্যাড. এনাম আহমদ বললেন, কেবল তাহিরপুর ও শাল্লায় নয় জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানিয়েছেন, সারের সরবরাহের কোন কমতি নেই। কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা এ ধরণের প্রচার করার অপচেষ্টা করলে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সার অতিরিক্ত দামে বিক্রয়েরও কোন সুযোগ নেই। ডিলার পয়েন্টে লাল সালু টাঙানো হয়েছে। লালু সালু যেখানে টাঙানো সেখানে কোন কৃষক যাবার পর দাম বেশি চাইলে, ওই ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কৃষি বিভাগের কর্মীদের এই বিষয়ে এই সময়ে আরও বেশি সতর্ক করে দেওয়া হবে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








