এম. ইলিয়াস আলী। বিএনপির ডাকসাইটের নেতা। ভারতীয় আগ্রাসন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজপথের অপ্রতিরোধ্য ও লড়াকু সৈনিক ছিলেন। ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আপোষহীন ছাত্রনেতা ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসময়ের আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির ঘাটি হিসেবে পরিচিত সিলেট ২ (বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ) আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে নিজেরে কর্মদক্ষতায় সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ও ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলনের কারনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী রেজিমের রোশনালে পড়েন তিনি। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতে রাজধানী ঢাকার রাজপথ থেকে নিজের ড্রাইভার সহ তাকে গুম করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার রেজিম। এঘটনার পর তাঁর নির্বাচনী এলাকা সিলেট-২ আসনের (তৎকালীন বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরবিশ্বনাথ) নেতাকর্মীরা নেমে পড়েন রাস্তায়। প্রিয় নেতাকে খোজে বের করতে মহাসড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচী দেয় স্থানীয় বিএনপিসহ জেলার নেতৃবৃন্দরা।
ইলিয়াস আলীর মুক্তির আন্দোলনে কাফনের কাপড় পড়েও রাস্তায় নেমে আসেন নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে তাঁর নিজ জন্মভূমি বিশ্বনাথে দু'জন কর্মী নিহত হন। তৎকালীন সময়ে ইলিয়াস মুক্তির আন্দোলন দামিয়ে রাখতে উঠে-পড়ে লাগে আওয়ামীলীগের দলীয় নেতাকর্মীরা। দলের এই ক্রান্তিলগ্নে লগ্নে এম ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতিতে নিজ নির্বাচনী এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের অভিবাবকের মতো ছায়া হয়ে আসেন তাঁর সহধর্মীনি তাহসিনা রুশদীর লুনা। এই এলাকার দলীয় নেতাকর্মী সহ সর্বস্থরের সাধারণ মানুষও লুনাকে হাসিমূখে বরণ করে নেন।
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ে সিলেট-২ আসনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রেখে বিএনপির হাল ধরে আছেন লুনা। দলীয় নেতাকর্মীদের মাতৃস্নেহে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। ইলিয়াস আলীর অবর্তমানে তৎক্ষালিন আওয়ামী লীগ রেজিম সারাদেশের ন্যায় সিলেট ২ আসনের বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতনের স্ট্রীম রোলার চালায় । কিন্তু লুনা নিজের দক্ষতায় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আওয়ামী লীগের রেজিমকে রাজপথে মোকাবেলা করেন।
আওয়ামীলীগকে রাজপথে মোকাবেলা করার পাশাপাশি নিজ নির্বাচনী এলাকার উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড থেকে শুরু করে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় দলকে সুসংগঠিত করেন। ফলে সেই সময়ের চরম ঝুলুম নির্যাতনের মধ্যেও ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথে উপজেলা পরিষদ সহ বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
ফলে ২০১৭ সালের ওসমানীনগর উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচনে এ উপজেলা আওয়ামীলীগের দুই শক্তিশালী নেতা শফিকুর রহমান চৌধুরী ও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর প্রেস্টিজ ইস্যুর লড়াইয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। রাজনীতির মাঠে কোনঠাসা অবস্থানে থাকা বিএনপিকে আরো শক্তিশালী করার লড়াই ছিলো সাবেক এমপি এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মীনি তাহসিনা রুশদীর লুনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এর পর ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা নাটকীয়তায় আটকে যায় লুনার মনোনয়ন। একই আসনে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইয়াহহিয়া চৌধুরীর করা এক রিট পিটিশনের শুনানি নিয়ে লুনার প্রার্থিতা বাতিলের আদেশ দেন হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ। আর তাতেই ভাগ্য খুলে ঐক্যফ্রন্ট সমর্থিত গণফোরামের সূর্য প্রতীকের প্রার্থী মোকাব্বির খানের। নির্বাচনে ইলিয়াস আলীর নাম ভাঙিয়ে বনে যান এই আসনের এমপি। বিশ্লেষকরা মনে করে বিএনপির ভোটাররা নিরব ভোট বিপ্লব ঘটান মোকাব্বিরের পক্ষে। তখনই আরো একবার সিলেট-২ আসনকে ইলিয়াস আলীর দুর্গ বলে আখ্যায়িত করেন জনসাধারণ আর সঙ্গে বাড়ে লুনার গ্রহণযোগ্যতা।দীর্ঘ এই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নানান সমস্যা, নিপীড়ন মোকাবেলা ইলিয়াসপত্নী লুনা এখন সিলেট-২ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীদের একমাত্র অবিভাবক। আগামী সংসদ নির্বাচনে এই আসনে লুনার নেতৃত্ব এ আসনে ভোট বিপ্লব ঘটবে।
গত বুধ ও বৃহষ্পতিবার বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে জানা গেছে, এই এলাকার রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু হয়ে খেটে খাওয়া মানুষ এম. ইলিয়াস আলীকে নিখাঁদ ভাবে ভালোবাসেন। তারা নিজেদের প্রিয় নেতাকে যেকোন মূল্যে ফিরে পেতে চান। আর ইলিয়াস আলীর অবর্তমানে এই আসানটিতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয়তায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন তাঁর সহধর্মীনী তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি ধানের শীষের প্রার্থী হলে ২০০১ সালের মতো আরেকটি ভোট বিপ্লব করবে এই আসনের সাধারণ মানুষ।
বিশ্বনাথ উপজেলার খাজান্সী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক গালিব মিয়া বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে আমরা মোকাব্বির খানকে চিনতামই না, শুধুমাত্র ভাবি (ইলিয়াসপত্নী) সমর্থন দিয়েছেন শুনে আমরা সূর্য মার্কায় ভোট দিয়েছি। আগামী নির্বাচনে ইলিয়াস আলীর সহধর্মীকে ভোট দিয়ে সংসদদে পাঠিয়ে আমাদের নেতাকে ফিরিয়ে আনার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করব।
ওসমানী নগর উপজেলার গলমুকাপন এলাকার দিনমজুর লোহিত আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই এই এলাকা উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল। এম ইলিয়াস আলী এমপি হওয়ার পর মাত্র ৫ বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তা আর কখনো হয়নি। আমরা দল-মত এত কিছু বুঝিনা, আমরা আমাদের নেতাকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত চাই। এজন্য ইলিয়াস আলীর সহধর্মীনীতে আমরা ভোট দেব।
আজকের সিলেট/এসটি
বিশেষ প্রতিবেদক 








